দেশের বিদ্যুৎ পরিস্থিতি ক্রমেই সংকটজনক হয়ে উঠছে। গ্যাসের তীব্র সংকট, কয়লা ও তরল জ্বালানির সরবরাহ ঘাটতি, বিদ্যুৎকেন্দ্রের কারিগরি ত্রুটি এবং কয়েকটি কেন্দ্রে রক্ষণাবেক্ষণ—সব মিলিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনে বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হয়েছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের বিদ্যুৎ সরবরাহে।
বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) ও পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ পিএলসির তথ্য অনুযায়ী, দেশের ১৩৭টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের মধ্যে গত বৃহস্পতিবার ৬২টি কেন্দ্রে উৎপাদন স্বাভাবিক ছিল না। এর মধ্যে ২০টি কেন্দ্রে পুরোপুরি উৎপাদন বন্ধ ছিল। অন্য ৪২টি কেন্দ্রও পূর্ণ সক্ষমতায় বিদ্যুৎ দিতে পারেনি।
ফলে দিনের ব্যস্ত সময়েও বড় ধরনের বিদ্যুৎ ঘাটতি দেখা দেয়। একপর্যায়ে সর্বোচ্চ লোডশেডিংয়ের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ৩ হাজার ৬৬৪ মেগাওয়াটে। চলতি মৌসুমে এর চেয়ে বেশি লোডশেডিং হয়েছিল গত ১০ আগস্ট, সেদিন সর্বোচ্চ ঘাটতি ছিল প্রায় ৩ হাজার ৭৫৭ মেগাওয়াট।
দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ২৯ হাজার মেগাওয়াট। কিন্তু বৃহস্পতিবার সর্বোচ্চ চাহিদার সময়ে উৎপাদন হয়েছে মাত্র ১৩ হাজার ২৮২ মেগাওয়াট। ওই সময়ে জাতীয় পর্যায়ে বিদ্যুতের চাহিদা ছিল প্রায় ১৬ হাজার ৯৪৬ মেগাওয়াট।
অর্থাৎ বিদ্যুৎ উৎপাদনের বিপুল সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও জ্বালানি ও অন্যান্য সংকটের কারণে তার বড় একটি অংশ কাজে লাগানো যাচ্ছে না।
বিশেষ করে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো সবচেয়ে বেশি চাপে রয়েছে। এসব কেন্দ্রের সম্মিলিত সক্ষমতা ১২ হাজার মেগাওয়াটের বেশি হলেও বর্তমানে ৫ হাজার মেগাওয়াটের সামান্য বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব হচ্ছে।
বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় গ্যাসের সরবরাহ কমিয়ে দেওয়ার কারণে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। গ্যাসের একটি বড় অংশ বর্তমানে শিল্পকারখানায় সরবরাহ করা হচ্ছে।
এক মাসের বেশি সময় ধরে দেশের বিভিন্ন এলাকায় গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট চললেও সাম্প্রতিক সময়ে রাজধানীতেও এর প্রভাব স্পষ্ট হয়েছে।
১২ আগস্ট থেকে ঢাকায় পরিকল্পিতভাবে লোডশেডিং শুরু হয়। ডিপিডিসি ও ডেসকো প্রতিটি এলাকায় নির্দিষ্ট সময় বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রাখার পরিকল্পনা করলেও বাস্তবে অনেক এলাকায় নির্ধারিত সময়ের চেয়ে বেশি সময় বিদ্যুৎ না থাকার অভিযোগ উঠেছে।
দিনের ব্যস্ত সময় কিংবা রাত—কোনো সময়ই পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক থাকছে না। এতে বাসাবাড়ি, অফিস, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষকে ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে।
বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বহুতল ভবনে লিফট ব্যবহারে সমস্যা তৈরি হচ্ছে। একই সঙ্গে পানি সরবরাহের ওপরও প্রভাব পড়ছে। কারণ অনেক ভবনের পানির পাম্প বিদ্যুতের ওপর নির্ভরশীল।
শুধু গ্যাস নয়, কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতেও দেখা দিয়েছে নানা সমস্যা।
দেশের আটটি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের সম্মিলিত সক্ষমতা প্রায় ৭ হাজার মেগাওয়াট। কিন্তু বর্তমানে এসব কেন্দ্র থেকে ৫ হাজার মেগাওয়াটের কম বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে।
কারিগরি সমস্যার কারণে পায়রা ও বড়পুকুরিয়া বিদ্যুৎকেন্দ্রে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। অন্যদিকে নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের কারণে মাতারবাড়ী বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি ইউনিট বন্ধ রয়েছে।
এ ছাড়া কয়লা সরবরাহে সমস্যার কারণে গত ৭ আগস্ট থেকে ভারতের আদানি গ্রুপের বিদ্যুৎকেন্দ্রটির উৎপাদনও কমেছে। কেন্দ্রটির উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ১ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট হলেও স্বাভাবিক সময়ে সেই পরিমাণ বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে না।
জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় উচ্চ ব্যয়ের তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো বেশি চালানোর উদ্যোগ নেওয়া হলেও সেখানেও দেখা দিয়েছে সরবরাহ সমস্যা।
তথ্য অনুযায়ী, দেশের ২৪টি বিদ্যুৎকেন্দ্রে ফার্নেস অয়েল ও ডিজেলের ঘাটতি রয়েছে। ফলে চাহিদা অনুযায়ী এসব কেন্দ্র থেকে উৎপাদন বাড়ানো যাচ্ছে না।
বিদ্যুৎ খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর সঙ্গে পিডিবির বকেয়া ও অন্যান্য বিরোধের সমাধান করা গেলে তেলভিত্তিক কেন্দ্র থেকে দ্রুত উৎপাদন বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে।
বিদ্যুৎ সংকটের পাশাপাশি গ্যাস সরবরাহ পরিস্থিতিও উদ্বেগজনক।
পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রতিদিন প্রায় ৩৮০ কোটি ঘনফুট গ্যাসের চাহিদা রয়েছে। এর বিপরীতে বৃহস্পতিবার সরবরাহ ছিল মাত্র ২৩৫ কোটি ঘনফুট।
অর্থাৎ দৈনিক চাহিদার তুলনায় সরবরাহে বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে। এই ঘাটতির কারণে বিদ্যুৎকেন্দ্রের পাশাপাশি শিল্পকারখানা ও বাসাবাড়িতেও প্রভাব পড়ছে।
মহেশখালীর ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের একটি দুর্ঘটনার পর সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের ধাক্কা লাগে। টার্মিনালটি পুনরায় সচল হলেও প্রয়োজনীয় এলএনজি কার্গো সময়মতো না আসায় সংকট পুরোপুরি কাটেনি।
বিদ্যুৎ ও গ্যাসের ঘাটতি শুধু সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় নয়, শিল্প ও ব্যবসা খাতেও প্রভাব ফেলছে।
বিদ্যুৎ সরবরাহে অনিয়মের কারণে উৎপাদন কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে বিকল্প জ্বালানির ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে, এতে উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে।
একই সঙ্গে গ্যাসের চাপ কম থাকায় শিল্পকারখানার উৎপাদন সক্ষমতাও কমে যাচ্ছে। দীর্ঘস্থায়ী এই সংকট অব্যাহত থাকলে শিল্প উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও সামগ্রিক অর্থনীতিতে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও ভোক্তা অধিকার সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের সামগ্রিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, স্বল্পমেয়াদে জ্বালানি সরবরাহ বাড়ানোর পাশাপাশি বিদ্যুৎ ও গ্যাস খাতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন। এলএনজি আমদানি, বিদ্যুৎকেন্দ্রের জ্বালানি ব্যবস্থাপনা, সরবরাহ অবকাঠামো এবং কেন্দ্রগুলোর রক্ষণাবেক্ষণে সমন্বিত উদ্যোগ না নিলে এ ধরনের সংকট বারবার দেখা দিতে পারে।
তাদের মতে, অনিয়ম ও ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা দূর করে জ্বালানি খাতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করাও জরুরি।
বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় গ্যাস, কয়লা ও তরল জ্বালানির নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করা।
একদিকে প্রায় ২৯ হাজার মেগাওয়াট উৎপাদন সক্ষমতা রয়েছে, অন্যদিকে জ্বালানি ও কারিগরি সমস্যার কারণে তার বড় অংশ ব্যবহার করা যাচ্ছে না। ফলে সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে না।
জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় লোডশেডিংয়ের চাপ অব্যাহত থাকার আশঙ্কা রয়েছে। এতে সাধারণ মানুষের পাশাপাশি শিল্প, ব্যবসা ও সেবা খাতেও বাড়তে পারে ভোগান্তি।
দেশের বিদ্যুৎ পরিস্থিতির স্থায়ী সমাধানের জন্য তাই জরুরি ভিত্তিতে জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা, অচল কেন্দ্রগুলো দ্রুত সচল করা এবং বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার বাস্তবায়নের প্রয়োজন দেখা দিয়েছে।

শনিবার, ০৩ অক্টোবর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৮ আগস্ট ২০২৬
দেশের বিদ্যুৎ পরিস্থিতি ক্রমেই সংকটজনক হয়ে উঠছে। গ্যাসের তীব্র সংকট, কয়লা ও তরল জ্বালানির সরবরাহ ঘাটতি, বিদ্যুৎকেন্দ্রের কারিগরি ত্রুটি এবং কয়েকটি কেন্দ্রে রক্ষণাবেক্ষণ—সব মিলিয়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনে বড় ধরনের ঘাটতি তৈরি হয়েছে। এর সরাসরি প্রভাব পড়েছে রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের বিদ্যুৎ সরবরাহে।
বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি) ও পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ পিএলসির তথ্য অনুযায়ী, দেশের ১৩৭টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের মধ্যে গত বৃহস্পতিবার ৬২টি কেন্দ্রে উৎপাদন স্বাভাবিক ছিল না। এর মধ্যে ২০টি কেন্দ্রে পুরোপুরি উৎপাদন বন্ধ ছিল। অন্য ৪২টি কেন্দ্রও পূর্ণ সক্ষমতায় বিদ্যুৎ দিতে পারেনি।
ফলে দিনের ব্যস্ত সময়েও বড় ধরনের বিদ্যুৎ ঘাটতি দেখা দেয়। একপর্যায়ে সর্বোচ্চ লোডশেডিংয়ের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ৩ হাজার ৬৬৪ মেগাওয়াটে। চলতি মৌসুমে এর চেয়ে বেশি লোডশেডিং হয়েছিল গত ১০ আগস্ট, সেদিন সর্বোচ্চ ঘাটতি ছিল প্রায় ৩ হাজার ৭৫৭ মেগাওয়াট।
দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ২৯ হাজার মেগাওয়াট। কিন্তু বৃহস্পতিবার সর্বোচ্চ চাহিদার সময়ে উৎপাদন হয়েছে মাত্র ১৩ হাজার ২৮২ মেগাওয়াট। ওই সময়ে জাতীয় পর্যায়ে বিদ্যুতের চাহিদা ছিল প্রায় ১৬ হাজার ৯৪৬ মেগাওয়াট।
অর্থাৎ বিদ্যুৎ উৎপাদনের বিপুল সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও জ্বালানি ও অন্যান্য সংকটের কারণে তার বড় একটি অংশ কাজে লাগানো যাচ্ছে না।
বিশেষ করে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো সবচেয়ে বেশি চাপে রয়েছে। এসব কেন্দ্রের সম্মিলিত সক্ষমতা ১২ হাজার মেগাওয়াটের বেশি হলেও বর্তমানে ৫ হাজার মেগাওয়াটের সামান্য বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব হচ্ছে।
বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় গ্যাসের সরবরাহ কমিয়ে দেওয়ার কারণে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। গ্যাসের একটি বড় অংশ বর্তমানে শিল্পকারখানায় সরবরাহ করা হচ্ছে।
এক মাসের বেশি সময় ধরে দেশের বিভিন্ন এলাকায় গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট চললেও সাম্প্রতিক সময়ে রাজধানীতেও এর প্রভাব স্পষ্ট হয়েছে।
১২ আগস্ট থেকে ঢাকায় পরিকল্পিতভাবে লোডশেডিং শুরু হয়। ডিপিডিসি ও ডেসকো প্রতিটি এলাকায় নির্দিষ্ট সময় বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রাখার পরিকল্পনা করলেও বাস্তবে অনেক এলাকায় নির্ধারিত সময়ের চেয়ে বেশি সময় বিদ্যুৎ না থাকার অভিযোগ উঠেছে।
দিনের ব্যস্ত সময় কিংবা রাত—কোনো সময়ই পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক থাকছে না। এতে বাসাবাড়ি, অফিস, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষকে ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে।
বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বহুতল ভবনে লিফট ব্যবহারে সমস্যা তৈরি হচ্ছে। একই সঙ্গে পানি সরবরাহের ওপরও প্রভাব পড়ছে। কারণ অনেক ভবনের পানির পাম্প বিদ্যুতের ওপর নির্ভরশীল।
শুধু গ্যাস নয়, কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোতেও দেখা দিয়েছে নানা সমস্যা।
দেশের আটটি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের সম্মিলিত সক্ষমতা প্রায় ৭ হাজার মেগাওয়াট। কিন্তু বর্তমানে এসব কেন্দ্র থেকে ৫ হাজার মেগাওয়াটের কম বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে।
কারিগরি সমস্যার কারণে পায়রা ও বড়পুকুরিয়া বিদ্যুৎকেন্দ্রে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। অন্যদিকে নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের কারণে মাতারবাড়ী বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি ইউনিট বন্ধ রয়েছে।
এ ছাড়া কয়লা সরবরাহে সমস্যার কারণে গত ৭ আগস্ট থেকে ভারতের আদানি গ্রুপের বিদ্যুৎকেন্দ্রটির উৎপাদনও কমেছে। কেন্দ্রটির উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ১ হাজার ৫০০ মেগাওয়াট হলেও স্বাভাবিক সময়ে সেই পরিমাণ বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে না।
জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় উচ্চ ব্যয়ের তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো বেশি চালানোর উদ্যোগ নেওয়া হলেও সেখানেও দেখা দিয়েছে সরবরাহ সমস্যা।
তথ্য অনুযায়ী, দেশের ২৪টি বিদ্যুৎকেন্দ্রে ফার্নেস অয়েল ও ডিজেলের ঘাটতি রয়েছে। ফলে চাহিদা অনুযায়ী এসব কেন্দ্র থেকে উৎপাদন বাড়ানো যাচ্ছে না।
বিদ্যুৎ খাত সংশ্লিষ্টদের মতে, বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর সঙ্গে পিডিবির বকেয়া ও অন্যান্য বিরোধের সমাধান করা গেলে তেলভিত্তিক কেন্দ্র থেকে দ্রুত উৎপাদন বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে।
বিদ্যুৎ সংকটের পাশাপাশি গ্যাস সরবরাহ পরিস্থিতিও উদ্বেগজনক।
পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রতিদিন প্রায় ৩৮০ কোটি ঘনফুট গ্যাসের চাহিদা রয়েছে। এর বিপরীতে বৃহস্পতিবার সরবরাহ ছিল মাত্র ২৩৫ কোটি ঘনফুট।
অর্থাৎ দৈনিক চাহিদার তুলনায় সরবরাহে বড় ধরনের ঘাটতি রয়েছে। এই ঘাটতির কারণে বিদ্যুৎকেন্দ্রের পাশাপাশি শিল্পকারখানা ও বাসাবাড়িতেও প্রভাব পড়ছে।
মহেশখালীর ভাসমান এলএনজি টার্মিনালের একটি দুর্ঘটনার পর সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের ধাক্কা লাগে। টার্মিনালটি পুনরায় সচল হলেও প্রয়োজনীয় এলএনজি কার্গো সময়মতো না আসায় সংকট পুরোপুরি কাটেনি।
বিদ্যুৎ ও গ্যাসের ঘাটতি শুধু সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় নয়, শিল্প ও ব্যবসা খাতেও প্রভাব ফেলছে।
বিদ্যুৎ সরবরাহে অনিয়মের কারণে উৎপাদন কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে বিকল্প জ্বালানির ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে, এতে উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে।
একই সঙ্গে গ্যাসের চাপ কম থাকায় শিল্পকারখানার উৎপাদন সক্ষমতাও কমে যাচ্ছে। দীর্ঘস্থায়ী এই সংকট অব্যাহত থাকলে শিল্প উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও সামগ্রিক অর্থনীতিতে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও ভোক্তা অধিকার সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের সামগ্রিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, স্বল্পমেয়াদে জ্বালানি সরবরাহ বাড়ানোর পাশাপাশি বিদ্যুৎ ও গ্যাস খাতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন। এলএনজি আমদানি, বিদ্যুৎকেন্দ্রের জ্বালানি ব্যবস্থাপনা, সরবরাহ অবকাঠামো এবং কেন্দ্রগুলোর রক্ষণাবেক্ষণে সমন্বিত উদ্যোগ না নিলে এ ধরনের সংকট বারবার দেখা দিতে পারে।
তাদের মতে, অনিয়ম ও ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা দূর করে জ্বালানি খাতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করাও জরুরি।
বর্তমান পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় গ্যাস, কয়লা ও তরল জ্বালানির নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করা।
একদিকে প্রায় ২৯ হাজার মেগাওয়াট উৎপাদন সক্ষমতা রয়েছে, অন্যদিকে জ্বালানি ও কারিগরি সমস্যার কারণে তার বড় অংশ ব্যবহার করা যাচ্ছে না। ফলে সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে না।
জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় লোডশেডিংয়ের চাপ অব্যাহত থাকার আশঙ্কা রয়েছে। এতে সাধারণ মানুষের পাশাপাশি শিল্প, ব্যবসা ও সেবা খাতেও বাড়তে পারে ভোগান্তি।
দেশের বিদ্যুৎ পরিস্থিতির স্থায়ী সমাধানের জন্য তাই জরুরি ভিত্তিতে জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা, অচল কেন্দ্রগুলো দ্রুত সচল করা এবং বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার বাস্তবায়নের প্রয়োজন দেখা দিয়েছে।

সম্পাদক : মাসুদ রানা
আপনার মতামত লিখুন