মতামত | ড. মুহম্মদ ইদ্রিছ ভূইয়া:
তিস্তা শুধু একটি নদীর নাম নয়; এটি বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের আস্থা, প্রতিবেশীসুলভ মনোভাব এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিরাপত্তারও একটি বড় পরীক্ষা। তাই তিস্তাকে কেবল কিউবিক ফুট, গ্যালন কিংবা লিটারের হিসাব দিয়ে দেখলে এর বৃহত্তর তাৎপর্য আড়ালেই থেকে যায়।
ব্রিটিশ আমলের আগে এবং ভারত বিভক্তির পূর্বে এ অঞ্চলের নদ-নদীগুলো মূলত তাদের স্বাভাবিক গতিপথেই প্রবাহিত হয়েছে। রাজনৈতিক সীমানা পরিবর্তিত হলেও প্রকৃতির নিজস্ব নিয়ম তখন কোনো কৃত্রিম সীমারেখা মানেনি। নদী তার গতিপথে বয়ে গেছে, পানির প্রবাহও ছিল প্রকৃতির নিয়মের অধীন।
কিন্তু সময়ের সঙ্গে উজানে পানি নিয়ন্ত্রণের সক্ষমতা ও অবকাঠামো তৈরি হয়েছে। এর ফলে ভাটির দেশের মানুষের মধ্যে পানি প্রবাহ নিয়ে উদ্বেগ ও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। তিস্তা তার সবচেয়ে বড় উদাহরণ।
এখানেই প্রশ্নটি শুধু পানিবণ্টনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়—একটি অভিন্ন নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ কতটা অক্ষুণ্ন রাখা হবে? প্রতিবেশী দেশের স্বার্থ ও উদ্বেগকে কতটা গুরুত্ব দেওয়া হবে? আর দুই দেশের মধ্যে পারস্পরিক আস্থার জায়গাটি কীভাবে আরও শক্তিশালী করা হবে?
তিস্তা নিয়ে দীর্ঘদিনের আলোচনা, বৈঠক ও কূটনৈতিক প্রচেষ্টার পরও স্থায়ী সমাধান না আসায় বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে হতাশা তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। কূটনীতি যদি শুধু পরিসংখ্যান, বৈঠক ও আশ্বাসের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে তার গ্রহণযোগ্যতা কমে যেতে পারে।
তাই তিস্তা ইস্যুতে প্রয়োজন নতুন দৃষ্টিভঙ্গি। কে কত কিউবিক ফুট বা কত লিটার পানি পাবে—এই হিসাবের পাশাপাশি নদীর পরিবেশগত ভারসাম্য, জীববৈচিত্র্য, কৃষি, মৎস্য, মানুষের জীবন-জীবিকা এবং নদীর স্বাভাবিক প্রবাহের বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দিতে হবে।
নদী কোনো দেশের একক সম্পদ নয়—বিশেষ করে যখন সেটি সীমান্ত পেরিয়ে দুই দেশের মানুষের জীবন ও অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত। একটি নদীর উজানের ব্যবস্থাপনার প্রভাব ভাটির মানুষের জীবনেও পড়ে। তাই এ ধরনের অভিন্ন নদী ব্যবস্থাপনায় পারস্পরিক আস্থা ও সহযোগিতাই হওয়া উচিত মূল ভিত্তি।
আমার বিশ্বাস, প্রতিবেশীর নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ নিশ্চিত করা শুধু পানি দেওয়ার বিষয় নয়; এটি একটি সুসম্পর্কের দরজাও খুলে দিতে পারে। পানি নিয়ে আস্থা তৈরি হলে সীমান্ত, বাণিজ্য, যোগাযোগ ও অন্যান্য দ্বিপক্ষীয় বিষয়েও সহযোগিতার নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে।
বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক বহুস্তরীয়। এই সম্পর্ককে আরও শক্তিশালী করতে হলে উভয় দেশের মানুষের স্বার্থকে গুরুত্ব দিয়ে দীর্ঘমেয়াদি ও ন্যায়সংগত সমাধানের পথে এগোতে হবে।
তিস্তার সমাধান তাই কেবল একটি পানিবণ্টন চুক্তির বিষয় নয়। এটি দুই দেশের রাজনৈতিক সদিচ্ছা, কূটনৈতিক আস্থা এবং প্রতিবেশীসুলভ সম্পর্কের পরীক্ষা।
প্রকৃতির ওপর মানুষের নিয়ন্ত্রণ যত বাড়ছে, ততই প্রয়োজন প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষার প্রতি আরও দায়িত্বশীল হওয়া। নদীকে তার স্বাভাবিক প্রবাহে বাঁচার সুযোগ দেওয়া মানে শুধু একটি নদীকে রক্ষা করা নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকা কোটি মানুষের জীবন ও ভবিষ্যৎকেও সুরক্ষিত করা।
নদীকে তার স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরিয়ে দেওয়ার পথ খুঁজতে হবে। শক্তিশালী করতে হবে প্রতিবেশীসুলভ সম্পর্ক। কারণ পানি শুধু জীবন দেয় না—পানি মানুষের সম্পর্কেও আস্থা ও সৌহার্দ্যের সেতু তৈরি করতে পারে।

শনিবার, ০৩ অক্টোবর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ২৯ আগস্ট ২০২৬
মতামত | ড. মুহম্মদ ইদ্রিছ ভূইয়া:
তিস্তা শুধু একটি নদীর নাম নয়; এটি বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের আস্থা, প্রতিবেশীসুলভ মনোভাব এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিরাপত্তারও একটি বড় পরীক্ষা। তাই তিস্তাকে কেবল কিউবিক ফুট, গ্যালন কিংবা লিটারের হিসাব দিয়ে দেখলে এর বৃহত্তর তাৎপর্য আড়ালেই থেকে যায়।
ব্রিটিশ আমলের আগে এবং ভারত বিভক্তির পূর্বে এ অঞ্চলের নদ-নদীগুলো মূলত তাদের স্বাভাবিক গতিপথেই প্রবাহিত হয়েছে। রাজনৈতিক সীমানা পরিবর্তিত হলেও প্রকৃতির নিজস্ব নিয়ম তখন কোনো কৃত্রিম সীমারেখা মানেনি। নদী তার গতিপথে বয়ে গেছে, পানির প্রবাহও ছিল প্রকৃতির নিয়মের অধীন।
কিন্তু সময়ের সঙ্গে উজানে পানি নিয়ন্ত্রণের সক্ষমতা ও অবকাঠামো তৈরি হয়েছে। এর ফলে ভাটির দেশের মানুষের মধ্যে পানি প্রবাহ নিয়ে উদ্বেগ ও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। তিস্তা তার সবচেয়ে বড় উদাহরণ।
এখানেই প্রশ্নটি শুধু পানিবণ্টনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়—একটি অভিন্ন নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ কতটা অক্ষুণ্ন রাখা হবে? প্রতিবেশী দেশের স্বার্থ ও উদ্বেগকে কতটা গুরুত্ব দেওয়া হবে? আর দুই দেশের মধ্যে পারস্পরিক আস্থার জায়গাটি কীভাবে আরও শক্তিশালী করা হবে?
তিস্তা নিয়ে দীর্ঘদিনের আলোচনা, বৈঠক ও কূটনৈতিক প্রচেষ্টার পরও স্থায়ী সমাধান না আসায় বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে হতাশা তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। কূটনীতি যদি শুধু পরিসংখ্যান, বৈঠক ও আশ্বাসের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে তার গ্রহণযোগ্যতা কমে যেতে পারে।
তাই তিস্তা ইস্যুতে প্রয়োজন নতুন দৃষ্টিভঙ্গি। কে কত কিউবিক ফুট বা কত লিটার পানি পাবে—এই হিসাবের পাশাপাশি নদীর পরিবেশগত ভারসাম্য, জীববৈচিত্র্য, কৃষি, মৎস্য, মানুষের জীবন-জীবিকা এবং নদীর স্বাভাবিক প্রবাহের বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দিতে হবে।
নদী কোনো দেশের একক সম্পদ নয়—বিশেষ করে যখন সেটি সীমান্ত পেরিয়ে দুই দেশের মানুষের জীবন ও অর্থনীতির সঙ্গে যুক্ত। একটি নদীর উজানের ব্যবস্থাপনার প্রভাব ভাটির মানুষের জীবনেও পড়ে। তাই এ ধরনের অভিন্ন নদী ব্যবস্থাপনায় পারস্পরিক আস্থা ও সহযোগিতাই হওয়া উচিত মূল ভিত্তি।
আমার বিশ্বাস, প্রতিবেশীর নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ নিশ্চিত করা শুধু পানি দেওয়ার বিষয় নয়; এটি একটি সুসম্পর্কের দরজাও খুলে দিতে পারে। পানি নিয়ে আস্থা তৈরি হলে সীমান্ত, বাণিজ্য, যোগাযোগ ও অন্যান্য দ্বিপক্ষীয় বিষয়েও সহযোগিতার নতুন সুযোগ তৈরি হতে পারে।
বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক বহুস্তরীয়। এই সম্পর্ককে আরও শক্তিশালী করতে হলে উভয় দেশের মানুষের স্বার্থকে গুরুত্ব দিয়ে দীর্ঘমেয়াদি ও ন্যায়সংগত সমাধানের পথে এগোতে হবে।
তিস্তার সমাধান তাই কেবল একটি পানিবণ্টন চুক্তির বিষয় নয়। এটি দুই দেশের রাজনৈতিক সদিচ্ছা, কূটনৈতিক আস্থা এবং প্রতিবেশীসুলভ সম্পর্কের পরীক্ষা।
প্রকৃতির ওপর মানুষের নিয়ন্ত্রণ যত বাড়ছে, ততই প্রয়োজন প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষার প্রতি আরও দায়িত্বশীল হওয়া। নদীকে তার স্বাভাবিক প্রবাহে বাঁচার সুযোগ দেওয়া মানে শুধু একটি নদীকে রক্ষা করা নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকা কোটি মানুষের জীবন ও ভবিষ্যৎকেও সুরক্ষিত করা।
নদীকে তার স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরিয়ে দেওয়ার পথ খুঁজতে হবে। শক্তিশালী করতে হবে প্রতিবেশীসুলভ সম্পর্ক। কারণ পানি শুধু জীবন দেয় না—পানি মানুষের সম্পর্কেও আস্থা ও সৌহার্দ্যের সেতু তৈরি করতে পারে।

সম্পাদক : মাসুদ রানা
আপনার মতামত লিখুন