বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ক্রিপ্টোকারেন্সি বিনিময় প্ল্যাটফর্ম বাইনান্সে বড় ধরনের সাইবার হামলার অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় প্রায় ৬৩০ কোটি ডলারের ডিজিটাল সম্পদ চুরি হয়েছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। হামলার পেছনে উত্তর কোরিয়ার রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতাপ্রাপ্ত হ্যাকারদের সংশ্লিষ্টতা থাকতে পারে বলে ধারণা করছেন ব্লকচেইন বিশ্লেষকেরা।
ঘটনাটি ক্রিপ্টোকারেন্সি খাতে নিরাপত্তা নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। হামলার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর বিটকয়েন, ইথারসহ একাধিক ডিজিটাল মুদ্রার দাম কমেছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে অর্থ উত্তোলন সাময়িকভাবে বন্ধ রাখার কথা জানিয়েছে বাইনান্স। একই সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবহারকারীদের লোকসানের দায় প্রতিষ্ঠানটি বহন করবে বলেও জানিয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, হামলার খবরের পর বিটকয়েনের দাম ছয় সপ্তাহের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে ৭৬ হাজার ৩৬৮ ডলারে দাঁড়ায়। ইথারের দামও ৩ শতাংশের বেশি কমে দুই মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন ২ হাজার ১৭৮ ডলারে নেমে আসে। বাইনান্সের নিজস্ব ডিজিটাল মুদ্রা বিএনবির দামও ২৪ ঘণ্টায় ৫ শতাংশ কমে ৭০৯ দশমিক ৭০ ডলারে দাঁড়ায়।
ক্রিপ্টো বাজারের এই অস্থিরতার প্রভাব পড়ে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের শেয়ারবাজারেও। ক্রিপ্টো এক্সচেঞ্জ কয়েনবেস গ্লোবালের শেয়ারের দাম ৪ দশমিক ৮ শতাংশ কমে যায়। তবে প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, এ হামলায় তারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি। বিটকয়েনে বড় অঙ্কের বিনিয়োগের জন্য পরিচিত স্ট্র্যাটেজির শেয়ারের দামও যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে লেনদেন-পরবর্তী সময়ে প্রায় ৬ শতাংশ কমে যায়।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ব্লকচেইন বিশ্লেষণ প্রতিষ্ঠান টিআরএম ল্যাবস ও চেইন্যালাইসিসের প্রাথমিক মূল্যায়ন অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) গভীর রাতে শুরু হওয়া হামলার মূল অংশটি প্রায় ২০ মিনিটের মধ্যে সম্পন্ন হয়।
টিআরএম ল্যাবসের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, হামলাকারীরা বাইনান্সের ব্যবহৃত ডিজিটাল ওয়ালেটগুলোকে এমনভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম হয়, যাতে সেখানকার সম্পদ হ্যাকারদের নিয়ন্ত্রণাধীন ওয়ালেটে স্থানান্তরিত হয়। ২০২৫ সালে ক্রিপ্টো এক্সচেঞ্জ বাইবিটে চালানো বড় ধরনের সাইবার হামলার সঙ্গেও এ ঘটনার মিল রয়েছে। ওই হামলার জন্য উত্তর কোরিয়াকে দায়ী করেছিল যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থা এফবিআই।
টিআরএম ল্যাবস ও চেইন্যালাইসিস উভয় প্রতিষ্ঠানই হামলায় উত্তর কোরিয়ার সংশ্লিষ্টতার বিষয়ে উচ্চমাত্রার আস্থা প্রকাশ করেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এসব মূল্যায়ন এখনো তদন্তকারীদের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নয়।
যুক্তরাষ্ট্র ও দক্ষিণ কোরিয়ার কর্তৃপক্ষ এবং সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের অভিযোগ, উত্তর কোরিয়া দীর্ঘদিন ধরে গোয়েন্দা তৎপরতা, আর্থিক চুরি ও অর্থ সংগ্রহের কাজে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় পরিচালিত সাইবার ইউনিট ব্যবহার করে আসছে। তবে পিয়ংইয়ং এ ধরনের অভিযোগ নিয়মিত অস্বীকার করে। এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে জেনেভায় জাতিসংঘে উত্তর কোরিয়ার মিশন ও চীনে দেশটির দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তাৎক্ষণিকভাবে কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছে রয়টার্স।
বাইনান্সের প্রাথমিক তদন্তে ধারণা করা হচ্ছে, প্রতিষ্ঠানের একজন প্রকৌশলীর ল্যাপটপ হ্যাক হওয়ার মাধ্যমে হামলার সূত্রপাত হতে পারে। ওই কম্পিউটার ব্যবহার করে হ্যাকাররা প্রতিষ্ঠানের একটি সিস্টেমে প্রবেশ করে অননুমোদিতভাবে সম্পদ সরিয়ে নেয় বলে সন্দেহ করা হচ্ছে।
বাইনান্স জানিয়েছে, হ্যাক হওয়া কম্পিউটারটি হামলার প্রবেশপথ হয়ে থাকতে পারে। নিরাপত্তা দল ওই কম্পিউটারের সূত্র ধরে পুরো ঘটনার গতিপথ শনাক্ত করার চেষ্টা করছে।
অন্যদিকে, টোকিওভিত্তিক বন্ধ হয়ে যাওয়া বিটকয়েন এক্সচেঞ্জ মাউন্ট গক্সের সাবেক প্রধান মার্ক কারপেলেসের ধারণা, হামলাকারীরা বাইনান্সের অন্তত দুটি ওয়ালেটের ব্যক্তিগত নিরাপত্তা চাবি বা ‘প্রাইভেট কি’ হাতিয়ে নিয়ে থাকতে পারে।
চুরি হওয়া সম্পদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ জব্দ করতে সক্ষম হয়েছে বলে জানিয়েছে কয়েকটি ডিজিটাল সম্পদ প্রতিষ্ঠান। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, স্টেবলকয়েন ইস্যুকারী টেথার প্রায় ১৫৭ কোটি ডলারের সম্পদ জব্দ করেছে। সার্কেল জব্দ করেছে ৮০ কোটি ডলারের বেশি সম্পদ।
ওয়ার্ল্ড লিবার্টি ফাইন্যান্সিয়াল জানিয়েছে, সম্পদ জব্দের কাজে তারা কাস্টোডিয়ান প্রতিষ্ঠান বিটগোর সঙ্গে কাজ করেছে। বাইনান্সের সহপ্রতিষ্ঠাতা ই হের তথ্য অনুযায়ী, ২ কোটি ৭০ লাখ ডলারের স্টেবলকয়েন এবং প্রায় ২০ লাখ ডলারের ওয়ার্ল্ড লিবার্টি টোকেন জব্দ করা হয়েছে। ক্রিপ্টো প্রতিষ্ঠান রিপলও প্রায় ২০ কোটি ডলারের সম্পদ জব্দ করেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বাইনান্স জানিয়েছে, অংশীদার প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে ক্ষতিগ্রস্ত সম্পদ শনাক্ত ও জব্দের চেষ্টা চলছে। এখন পর্যন্ত প্রায় ৩০০ কোটি ডলারের সম্পদের সন্ধান পাওয়া গেছে বলে প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। আগামী ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে অর্থ উত্তোলন কার্যক্রম পুনরায় চালুর আশা প্রকাশ করেছে তারা। তবে অবশিষ্ট সম্পদের বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে বিস্তারিত জানানো হয়নি।
প্রতিষ্ঠানটির সহপ্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা রিচার্ড টেং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লিখেছেন, ব্যবহারকারীদের অর্থ নিরাপদ রয়েছে এবং ক্ষতির দায় প্রতিষ্ঠানটি নেবে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, তদন্তে এখনো নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তিকে দায়ী করা হয়নি।
বাইনান্সের ২০২৫ সালের বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে প্রতিষ্ঠানটির নিবন্ধিত ব্যবহারকারীর সংখ্যা ছিল ৩৩ কোটি ৫০ লাখ। গ্রাহকদের পক্ষে প্রতিষ্ঠানটির হেফাজতে থাকা ডিজিটাল সম্পদের পরিমাণ ছিল প্রায় ১৬ হাজার ২৮০ কোটি ডলার।
ব্যবহারকারীদের সম্পদ সুরক্ষায় বাইনান্সের ‘সিকিউর অ্যাসেট ফান্ড ফর ইউজারস’ বা ‘সাফু’ নামে একটি বিশেষ তহবিল রয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এ তহবিলে সম্পূর্ণ বিটকয়েন আকারে ১০০ কোটি ডলার সংরক্ষিত রয়েছে। রিচার্ড টেং জানিয়েছেন, ক্ষতিপূরণ দিতে এই তহবিলের পাশাপাশি কোম্পানির নিজস্ব অর্থও ব্যবহার করা হবে।
বাজারসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান জিএসআরের অরবিন্দ শ্রীনিবাসন ঘটনাটিকে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় হ্যাকিংয়ের ঘটনাগুলোর একটি হিসেবে বর্ণনা করেছেন। অন্যদিকে, হংকংভিত্তিক হ্যাশকি গ্রুপের জ্যেষ্ঠ গবেষক টিম সানের মতে, এমন ঘটনা বিনিয়োগকারীদের ঝুঁকি নেওয়ার প্রবণতা কমিয়ে দিতে পারে এবং কেন্দ্রীয়ভাবে পরিচালিত এক্সচেঞ্জে সম্পদ রাখার নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করতে পারে।
ক্রিপ্টোকারেন্সি বাজার এমনিতেই সুদের হার বৃদ্ধি এবং এক্সচেঞ্জ-ট্রেডেড ফান্ডে (ইটিএফ) বিনিয়োগকারীদের চাহিদা কমে যাওয়ার চাপের মধ্যে রয়েছে বলে বিশ্লেষকেরা উল্লেখ করেছেন। এর মধ্যে বড় ধরনের সাইবার হামলার খবর বিনিয়োগকারীদের আস্থায় আরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
টিআরএম ল্যাবসের গবেষকদের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর প্রায় ১৫০টি পৃথক সাইবার হামলায় ২৯০ কোটি ডলারের ক্রিপ্টোকারেন্সি চুরি হয়েছিল। এ ছাড়া গত সেপ্টেম্বরে ক্রিপ্টো এক্সচেঞ্জ বিটগেটও তাদের প্ল্যাটফর্ম থেকে প্রায় ৩৫ কোটি ডলারের ক্রিপ্টো সম্পদ চুরির কথা জানিয়েছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সাইবার হামলার ধারাবাহিক এসব ঘটনা ডিজিটাল সম্পদের নিরাপত্তা, ওয়ালেট ব্যবস্থাপনা এবং ক্রিপ্টো এক্সচেঞ্জগুলোর সুরক্ষা কাঠামো নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।
শনিবার, ০৭ নভেম্বর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ৩০ অক্টোবর ২০২৬
বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ক্রিপ্টোকারেন্সি বিনিময় প্ল্যাটফর্ম বাইনান্সে বড় ধরনের সাইবার হামলার অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় প্রায় ৬৩০ কোটি ডলারের ডিজিটাল সম্পদ চুরি হয়েছে বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। হামলার পেছনে উত্তর কোরিয়ার রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতাপ্রাপ্ত হ্যাকারদের সংশ্লিষ্টতা থাকতে পারে বলে ধারণা করছেন ব্লকচেইন বিশ্লেষকেরা।
ঘটনাটি ক্রিপ্টোকারেন্সি খাতে নিরাপত্তা নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। হামলার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর বিটকয়েন, ইথারসহ একাধিক ডিজিটাল মুদ্রার দাম কমেছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে অর্থ উত্তোলন সাময়িকভাবে বন্ধ রাখার কথা জানিয়েছে বাইনান্স। একই সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবহারকারীদের লোকসানের দায় প্রতিষ্ঠানটি বহন করবে বলেও জানিয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, হামলার খবরের পর বিটকয়েনের দাম ছয় সপ্তাহের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে ৭৬ হাজার ৩৬৮ ডলারে দাঁড়ায়। ইথারের দামও ৩ শতাংশের বেশি কমে দুই মাসের মধ্যে সর্বনিম্ন ২ হাজার ১৭৮ ডলারে নেমে আসে। বাইনান্সের নিজস্ব ডিজিটাল মুদ্রা বিএনবির দামও ২৪ ঘণ্টায় ৫ শতাংশ কমে ৭০৯ দশমিক ৭০ ডলারে দাঁড়ায়।
ক্রিপ্টো বাজারের এই অস্থিরতার প্রভাব পড়ে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের শেয়ারবাজারেও। ক্রিপ্টো এক্সচেঞ্জ কয়েনবেস গ্লোবালের শেয়ারের দাম ৪ দশমিক ৮ শতাংশ কমে যায়। তবে প্রতিষ্ঠানটি জানিয়েছে, এ হামলায় তারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়নি। বিটকয়েনে বড় অঙ্কের বিনিয়োগের জন্য পরিচিত স্ট্র্যাটেজির শেয়ারের দামও যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে লেনদেন-পরবর্তী সময়ে প্রায় ৬ শতাংশ কমে যায়।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ব্লকচেইন বিশ্লেষণ প্রতিষ্ঠান টিআরএম ল্যাবস ও চেইন্যালাইসিসের প্রাথমিক মূল্যায়ন অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) গভীর রাতে শুরু হওয়া হামলার মূল অংশটি প্রায় ২০ মিনিটের মধ্যে সম্পন্ন হয়।
টিআরএম ল্যাবসের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, হামলাকারীরা বাইনান্সের ব্যবহৃত ডিজিটাল ওয়ালেটগুলোকে এমনভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে সক্ষম হয়, যাতে সেখানকার সম্পদ হ্যাকারদের নিয়ন্ত্রণাধীন ওয়ালেটে স্থানান্তরিত হয়। ২০২৫ সালে ক্রিপ্টো এক্সচেঞ্জ বাইবিটে চালানো বড় ধরনের সাইবার হামলার সঙ্গেও এ ঘটনার মিল রয়েছে। ওই হামলার জন্য উত্তর কোরিয়াকে দায়ী করেছিল যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় তদন্ত সংস্থা এফবিআই।
টিআরএম ল্যাবস ও চেইন্যালাইসিস উভয় প্রতিষ্ঠানই হামলায় উত্তর কোরিয়ার সংশ্লিষ্টতার বিষয়ে উচ্চমাত্রার আস্থা প্রকাশ করেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তবে এসব মূল্যায়ন এখনো তদন্তকারীদের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নয়।
যুক্তরাষ্ট্র ও দক্ষিণ কোরিয়ার কর্তৃপক্ষ এবং সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞদের অভিযোগ, উত্তর কোরিয়া দীর্ঘদিন ধরে গোয়েন্দা তৎপরতা, আর্থিক চুরি ও অর্থ সংগ্রহের কাজে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় পরিচালিত সাইবার ইউনিট ব্যবহার করে আসছে। তবে পিয়ংইয়ং এ ধরনের অভিযোগ নিয়মিত অস্বীকার করে। এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে জেনেভায় জাতিসংঘে উত্তর কোরিয়ার মিশন ও চীনে দেশটির দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তাৎক্ষণিকভাবে কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি বলে জানিয়েছে রয়টার্স।
বাইনান্সের প্রাথমিক তদন্তে ধারণা করা হচ্ছে, প্রতিষ্ঠানের একজন প্রকৌশলীর ল্যাপটপ হ্যাক হওয়ার মাধ্যমে হামলার সূত্রপাত হতে পারে। ওই কম্পিউটার ব্যবহার করে হ্যাকাররা প্রতিষ্ঠানের একটি সিস্টেমে প্রবেশ করে অননুমোদিতভাবে সম্পদ সরিয়ে নেয় বলে সন্দেহ করা হচ্ছে।
বাইনান্স জানিয়েছে, হ্যাক হওয়া কম্পিউটারটি হামলার প্রবেশপথ হয়ে থাকতে পারে। নিরাপত্তা দল ওই কম্পিউটারের সূত্র ধরে পুরো ঘটনার গতিপথ শনাক্ত করার চেষ্টা করছে।
অন্যদিকে, টোকিওভিত্তিক বন্ধ হয়ে যাওয়া বিটকয়েন এক্সচেঞ্জ মাউন্ট গক্সের সাবেক প্রধান মার্ক কারপেলেসের ধারণা, হামলাকারীরা বাইনান্সের অন্তত দুটি ওয়ালেটের ব্যক্তিগত নিরাপত্তা চাবি বা ‘প্রাইভেট কি’ হাতিয়ে নিয়ে থাকতে পারে।
চুরি হওয়া সম্পদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ জব্দ করতে সক্ষম হয়েছে বলে জানিয়েছে কয়েকটি ডিজিটাল সম্পদ প্রতিষ্ঠান। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, স্টেবলকয়েন ইস্যুকারী টেথার প্রায় ১৫৭ কোটি ডলারের সম্পদ জব্দ করেছে। সার্কেল জব্দ করেছে ৮০ কোটি ডলারের বেশি সম্পদ।
ওয়ার্ল্ড লিবার্টি ফাইন্যান্সিয়াল জানিয়েছে, সম্পদ জব্দের কাজে তারা কাস্টোডিয়ান প্রতিষ্ঠান বিটগোর সঙ্গে কাজ করেছে। বাইনান্সের সহপ্রতিষ্ঠাতা ই হের তথ্য অনুযায়ী, ২ কোটি ৭০ লাখ ডলারের স্টেবলকয়েন এবং প্রায় ২০ লাখ ডলারের ওয়ার্ল্ড লিবার্টি টোকেন জব্দ করা হয়েছে। ক্রিপ্টো প্রতিষ্ঠান রিপলও প্রায় ২০ কোটি ডলারের সম্পদ জব্দ করেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বাইনান্স জানিয়েছে, অংশীদার প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে ক্ষতিগ্রস্ত সম্পদ শনাক্ত ও জব্দের চেষ্টা চলছে। এখন পর্যন্ত প্রায় ৩০০ কোটি ডলারের সম্পদের সন্ধান পাওয়া গেছে বলে প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। আগামী ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে অর্থ উত্তোলন কার্যক্রম পুনরায় চালুর আশা প্রকাশ করেছে তারা। তবে অবশিষ্ট সম্পদের বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে বিস্তারিত জানানো হয়নি।
প্রতিষ্ঠানটির সহপ্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা রিচার্ড টেং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে লিখেছেন, ব্যবহারকারীদের অর্থ নিরাপদ রয়েছে এবং ক্ষতির দায় প্রতিষ্ঠানটি নেবে। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, তদন্তে এখনো নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তিকে দায়ী করা হয়নি।
বাইনান্সের ২০২৫ সালের বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে প্রতিষ্ঠানটির নিবন্ধিত ব্যবহারকারীর সংখ্যা ছিল ৩৩ কোটি ৫০ লাখ। গ্রাহকদের পক্ষে প্রতিষ্ঠানটির হেফাজতে থাকা ডিজিটাল সম্পদের পরিমাণ ছিল প্রায় ১৬ হাজার ২৮০ কোটি ডলার।
ব্যবহারকারীদের সম্পদ সুরক্ষায় বাইনান্সের ‘সিকিউর অ্যাসেট ফান্ড ফর ইউজারস’ বা ‘সাফু’ নামে একটি বিশেষ তহবিল রয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এ তহবিলে সম্পূর্ণ বিটকয়েন আকারে ১০০ কোটি ডলার সংরক্ষিত রয়েছে। রিচার্ড টেং জানিয়েছেন, ক্ষতিপূরণ দিতে এই তহবিলের পাশাপাশি কোম্পানির নিজস্ব অর্থও ব্যবহার করা হবে।
বাজারসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান জিএসআরের অরবিন্দ শ্রীনিবাসন ঘটনাটিকে ইতিহাসের সবচেয়ে বড় হ্যাকিংয়ের ঘটনাগুলোর একটি হিসেবে বর্ণনা করেছেন। অন্যদিকে, হংকংভিত্তিক হ্যাশকি গ্রুপের জ্যেষ্ঠ গবেষক টিম সানের মতে, এমন ঘটনা বিনিয়োগকারীদের ঝুঁকি নেওয়ার প্রবণতা কমিয়ে দিতে পারে এবং কেন্দ্রীয়ভাবে পরিচালিত এক্সচেঞ্জে সম্পদ রাখার নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করতে পারে।
ক্রিপ্টোকারেন্সি বাজার এমনিতেই সুদের হার বৃদ্ধি এবং এক্সচেঞ্জ-ট্রেডেড ফান্ডে (ইটিএফ) বিনিয়োগকারীদের চাহিদা কমে যাওয়ার চাপের মধ্যে রয়েছে বলে বিশ্লেষকেরা উল্লেখ করেছেন। এর মধ্যে বড় ধরনের সাইবার হামলার খবর বিনিয়োগকারীদের আস্থায় আরও নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
টিআরএম ল্যাবসের গবেষকদের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর প্রায় ১৫০টি পৃথক সাইবার হামলায় ২৯০ কোটি ডলারের ক্রিপ্টোকারেন্সি চুরি হয়েছিল। এ ছাড়া গত সেপ্টেম্বরে ক্রিপ্টো এক্সচেঞ্জ বিটগেটও তাদের প্ল্যাটফর্ম থেকে প্রায় ৩৫ কোটি ডলারের ক্রিপ্টো সম্পদ চুরির কথা জানিয়েছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সাইবার হামলার ধারাবাহিক এসব ঘটনা ডিজিটাল সম্পদের নিরাপত্তা, ওয়ালেট ব্যবস্থাপনা এবং ক্রিপ্টো এক্সচেঞ্জগুলোর সুরক্ষা কাঠামো নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।
সম্পাদক : মাসুদ রানা
আপনার মতামত লিখুন