Nagorik Somoy News

ভুয়া বিয়ের আড়ালে নারী পাচারের অভিযোগ চীনযাত্রার পরিসংখ্যানে উদ্বেগ



ভুয়া বিয়ের আড়ালে নারী পাচারের অভিযোগ চীনযাত্রার পরিসংখ্যানে উদ্বেগ

প্রেম ও বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে বাংলাদেশের দরিদ্র ও প্রান্তিক নারীদের চীনে নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ ঘিরে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ভালোবাসার সম্পর্ক, উন্নত জীবনের স্বপ্ন ও সুখের সংসারের আশ্বাস দিয়ে কিছু নারীকে বিদেশি নাগরিকদের সঙ্গে বিয়ের সম্পর্কে জড়ানো হচ্ছে। পরে সেই বিয়েকে ব্যবহার করে তাদের চীনে নেওয়া হচ্ছে এবং সেখানে গিয়ে কেউ পাচার, নির্যাতন কিংবা অন্য ধরনের শোষণের শিকার হচ্ছেন—এমন অভিযোগ সামনে এসেছে।

সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, এ ধরনের ঘটনায় প্রকৃত ভুক্তভোগীর সংখ্যা কত, তাদের মধ্যে কতজন নির্যাতনের শিকার হয়েছেন কিংবা কতজন দেশে ফিরে এসেছেন—এ বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ সরকারি পরিসংখ্যান নেই। ফলে বিয়ের আড়ালে নারীদের পাচারের অভিযোগের প্রকৃত চিত্র এখনও অনেকটাই অজানা।

সম্প্রতি ঢাকায় মানবপাচার প্রতিরোধে আয়োজিত একটি কর্মশালায় এ বিষয়ে উদ্বেগজনক তথ্য ও নানা সুপারিশ তুলে ধরা হয়। ব্রিটিশ হাইকমিশনের সহায়তায় মানবপাচার প্রতিরোধে কাজ করা সংস্থা জাস্টিস অ্যান্ড কেয়ার বাংলাদেশ কর্মশালাটির আয়োজন করে।

ছয় বছরে কিউ-১ ভিসায় চীনে ৪ হাজার ২২৬ বাংলাদেশি নারী

কর্মশালায় উপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত ছয় বছরে কিউ-১ ভিসায় মোট ৪ হাজার ২২৬ বাংলাদেশি নারী চীনে গেছেন। এর মধ্যে ২০২৫ সালেই গেছেন ১ হাজার ৭২১ জন।

পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ২০২০ সালে কিউ-১ ভিসায় চীনে গিয়েছিলেন ৬৯ বাংলাদেশি নারী। ২০২১ সালে এ সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে দাঁড়ায় মাত্র ৭ জনে। ২০২২ সালে ৩৫ জন নারী এই ভিসায় চীনে যান।

এরপর থেকেই পরিস্থিতিতে বড় পরিবর্তন দেখা যায়। ২০২৩ সালে কিউ-১ ভিসায় চীনগামী বাংলাদেশি নারীর সংখ্যা এক লাফে বেড়ে দাঁড়ায় ১ হাজার ১৬ জনে। ২০২৪ সালে এ সংখ্যা আরও বেড়ে হয় ১ হাজার ৩৭৮। আর ২০২৫ সালে তা ছাড়িয়ে যায় দেড় হাজারের ঘর—চীনে যান ১ হাজার ৭২১ বাংলাদেশি নারী।

অর্থাৎ, মাত্র তিন বছরের ব্যবধানে কিউ-১ ভিসায় চীনে যাওয়া বাংলাদেশি নারীর সংখ্যা ব্যাপকভাবে বেড়েছে।

কিউ-১ ভিসায় চীনে যাওয়া নারীদের সবাই যে পাচারের শিকার হয়েছেন, এমন কোনো তথ্য নেই। তবে ভুয়া বিয়ের মাধ্যমে বাংলাদেশি নারীদের চীনে পাচারের অভিযোগ সামনে আসার পর এই বিপুল সংখ্যক নারী চীনযাত্রা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগের জায়গা মূলত এখানেই—বিয়ের উদ্দেশ্যে বিদেশে যাওয়া নারীদের কতজন প্রকৃতপক্ষে স্বামীর সঙ্গে স্বাভাবিক জীবনযাপন করছেন, কতজন নির্যাতনের শিকার হয়েছেন এবং কতজন কোনো না কোনো কারণে দেশে ফিরে এসেছেন, তার নির্ভরযোগ্য তথ্য সংরক্ষণ করা হচ্ছে কি না।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, বিদেশি নাগরিকের সঙ্গে বিয়ের ক্ষেত্রে শুধু কাগজপত্র যাচাই করলেই হবে না; সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির পরিচয়, বৈবাহিক অবস্থা, পেশা, পারিবারিক তথ্য এবং বিয়ের প্রকৃত উদ্দেশ্যও যাচাই করা প্রয়োজন।

সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, বিদেশে ভালো জীবন ও সুখের সংসারের স্বপ্ন দেখিয়ে অসহায় নারীদের একটি অংশকে টার্গেট করছে প্রতারক চক্র। সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে থাকা পরিবারের নারীরা এ ধরনের প্রলোভনের ক্ষেত্রে তুলনামূলকভাবে বেশি ঝুঁকিতে পড়তে পারেন।

প্রথমে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কিংবা পরিচিত ব্যক্তির মাধ্যমে সম্পর্ক তৈরি হতে পারে। এরপর বিয়ে এবং বিদেশে নিয়ে যাওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়। পরিবারকে উন্নত জীবনযাপনের আশ্বাস দেওয়া হলেও বিদেশে যাওয়ার পর বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন হতে পারে—এমন অভিযোগও রয়েছে।

তবে কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা সম্প্রদায়ের সব সদস্যকে এ ধরনের কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত করা ঠিক নয়। অভিযোগের ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও চক্রের বিরুদ্ধে যথাযথ তদন্তের মাধ্যমে ব্যবস্থা নেওয়াই জরুরি।

কর্মশালায় ইমিগ্রেশনের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. আবু নোমান জানান, অপরাধী চক্র ভিসা পাওয়ার জন্য ভুয়া কাগজপত্র তৈরি করে বিদ্যমান প্রক্রিয়ার অপব্যবহার করছে। এ ধরনের অপরাধ প্রতিরোধে সম্ভাব্য ভুক্তভোগীদের সুরক্ষায় ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষ বিভিন্ন ব্যবস্থা নিয়েছে বলেও জানান তিনি।

এ কারণে বিদেশি নাগরিকের সঙ্গে বিয়ের ক্ষেত্রে কাগজপত্র যাচাইয়ের পাশাপাশি ভিসা আবেদন ও বিদেশযাত্রার পুরো প্রক্রিয়ায় আরও কঠোর নজরদারির প্রয়োজনীয়তা সামনে এসেছে।

বিদেশি নাগরিকদের সঙ্গে বাংলাদেশি নারীদের বিয়ের বিষয়টি আরও কঠোরভাবে যাচাই-বাছাই করতে একটি প্রস্তাবিত ‘স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউর’ বা এসওপি বর্তমানে আইন মন্ত্রণালয়ের পর্যালোচনায় রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

প্রস্তাবিত প্রক্রিয়ায় বিয়ে নিবন্ধনের পর বিয়ে সনদ প্রথমে নোটারি পাবলিক এবং পরে আইন মন্ত্রণালয় ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে সত্যায়নের কথা বলা হয়েছে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, এই প্রক্রিয়া কার্যকর হলে ভুয়া পরিচয়, জাল কাগজপত্র এবং বিয়ের আড়ালে মানবপাচারের ঝুঁকি শনাক্ত করা তুলনামূলক সহজ হতে পারে।

মাইগ্রেশন প্রোগ্রাম ও ইয়ুথ প্ল্যাটফর্মের সহযোগী পরিচালক শরীফুল হাসান বলেন, বিদেশি নাগরিককে বিয়ে করার আগে তার পরিচয় ও নাগরিকত্বসহ প্রয়োজনীয় তথ্য যাচাই করা জরুরি। একই সঙ্গে বিয়ের পর বিদেশে যাওয়া নারীদের পরিস্থিতি সম্পর্কে রাষ্ট্রীয়ভাবে তথ্য রাখা প্রয়োজন।

তার মতে, কতজন নারী বিদেশে গেছেন, তাদের মধ্যে কতজন নির্যাতনের শিকার হয়েছেন, কতজন দেশে ফিরে এসেছেন এবং কেন ফিরে এসেছেন—এসব তথ্যের একটি কার্যকর ডাটাবেজ থাকা দরকার।

তিনি আরও বলেন, অসহায় ও দরিদ্র নারীদের টার্গেট করে কেউ বিয়ের নামে অন্য কোনো উদ্দেশ্যে বিদেশে নিয়ে যাচ্ছে কি না, সেটিও সরকারের নজরদারির আওতায় আনা প্রয়োজন।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব ড. জিয়াউদ্দিন আহমেদ বলেন, বিয়ের কথা বলে কোনো নারীকে বিদেশে নিয়ে গিয়ে অন্য কোনো কাজে নিয়োজিত করা বা নির্যাতন করা হলে তা আন্তঃদেশীয় সংঘবদ্ধ অপরাধের আওতায় পড়তে পারে।

তিনি জানান, এ ধরনের বিষয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বিভিন্ন কার্যক্রমের মাধ্যমে মানুষকে সতর্ক করছে। চীনা নাগরিকদের সঙ্গে বিয়ে এবং কিউ-১ ভিসায় বাংলাদেশি নারীদের চীনে যাওয়ার বিষয়টিও সংশ্লিষ্ট দূতাবাসকে অবহিত করা হয়েছে বলে তিনি জানান।

মানবপাচার প্রতিরোধে শুধু সন্দেহজনক বিয়ে বন্ধ করা বা কয়েকটি ঘটনায় ব্যবস্থা নেওয়াই যথেষ্ট নয়। বিদেশি নাগরিকের সঙ্গে বিয়ের ক্ষেত্রে একটি স্বচ্ছ ও কার্যকর যাচাইব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন।

একই সঙ্গে বিদেশে যাওয়া নারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দূতাবাস ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো, অভিযোগ জানানোর সহজ ব্যবস্থা তৈরি এবং দেশে ফিরে আসা নারীদের তথ্য সংরক্ষণ করা জরুরি।

বিশেষ করে দরিদ্র ও প্রান্তিক পরিবারের নারীদের বিদেশে বিয়ে কিংবা অভিবাসনের ক্ষেত্রে ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতন করতে ইউনিয়ন, উপজেলা ও জেলা পর্যায়ে প্রচারণা চালানোর প্রয়োজন রয়েছে।

বিদেশি নাগরিককে বিয়ে করা নিজেই কোনো অপরাধ নয়। তবে বিয়ের সুযোগকে ব্যবহার করে যদি কোনো নারীকে প্রতারণা, পাচার, নির্যাতন বা শোষণের শিকার করা হয়, তাহলে সেটি অত্যন্ত গুরুতর অপরাধ।

তাই বিদেশে বিয়ের প্রস্তাব পাওয়া নারীদের জন্য পরিচয় যাচাই, বিয়ের নিবন্ধন, ভিসা প্রক্রিয়া এবং বিদেশে অবস্থান—প্রতিটি ধাপে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে পরিবারকেও আবেগের পাশাপাশি বাস্তব তথ্য যাচাই করতে হবে।

চীনে কিউ-১ ভিসায় বাংলাদেশি নারীদের যাতায়াতের সংখ্যা দ্রুত বেড়ে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে এখনই কার্যকর নজরদারি ও তথ্য সংগ্রহ শুরু করা প্রয়োজন। বিয়ের নামে কোনো নারী যেন প্রতারণার শিকার না হন এবং সুখের সংসারের স্বপ্ন যেন মানবপাচারের ফাঁদে পরিণত না হয়—এটাই এখন সংশ্লিষ্টদের সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা।

আপনার মতামত লিখুন

Nagorik Somoy News

শনিবার, ০৩ অক্টোবর ২০২৬


ভুয়া বিয়ের আড়ালে নারী পাচারের অভিযোগ চীনযাত্রার পরিসংখ্যানে উদ্বেগ

প্রকাশের তারিখ : ২৫ আগস্ট ২০২৬

featured Image

প্রেম ও বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে বাংলাদেশের দরিদ্র ও প্রান্তিক নারীদের চীনে নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ ঘিরে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। ভালোবাসার সম্পর্ক, উন্নত জীবনের স্বপ্ন ও সুখের সংসারের আশ্বাস দিয়ে কিছু নারীকে বিদেশি নাগরিকদের সঙ্গে বিয়ের সম্পর্কে জড়ানো হচ্ছে। পরে সেই বিয়েকে ব্যবহার করে তাদের চীনে নেওয়া হচ্ছে এবং সেখানে গিয়ে কেউ পাচার, নির্যাতন কিংবা অন্য ধরনের শোষণের শিকার হচ্ছেন—এমন অভিযোগ সামনে এসেছে।

সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, এ ধরনের ঘটনায় প্রকৃত ভুক্তভোগীর সংখ্যা কত, তাদের মধ্যে কতজন নির্যাতনের শিকার হয়েছেন কিংবা কতজন দেশে ফিরে এসেছেন—এ বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ সরকারি পরিসংখ্যান নেই। ফলে বিয়ের আড়ালে নারীদের পাচারের অভিযোগের প্রকৃত চিত্র এখনও অনেকটাই অজানা।

সম্প্রতি ঢাকায় মানবপাচার প্রতিরোধে আয়োজিত একটি কর্মশালায় এ বিষয়ে উদ্বেগজনক তথ্য ও নানা সুপারিশ তুলে ধরা হয়। ব্রিটিশ হাইকমিশনের সহায়তায় মানবপাচার প্রতিরোধে কাজ করা সংস্থা জাস্টিস অ্যান্ড কেয়ার বাংলাদেশ কর্মশালাটির আয়োজন করে।

ছয় বছরে কিউ-১ ভিসায় চীনে ৪ হাজার ২২৬ বাংলাদেশি নারী

কর্মশালায় উপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত ছয় বছরে কিউ-১ ভিসায় মোট ৪ হাজার ২২৬ বাংলাদেশি নারী চীনে গেছেন। এর মধ্যে ২০২৫ সালেই গেছেন ১ হাজার ৭২১ জন।

পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ২০২০ সালে কিউ-১ ভিসায় চীনে গিয়েছিলেন ৬৯ বাংলাদেশি নারী। ২০২১ সালে এ সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে দাঁড়ায় মাত্র ৭ জনে। ২০২২ সালে ৩৫ জন নারী এই ভিসায় চীনে যান।

এরপর থেকেই পরিস্থিতিতে বড় পরিবর্তন দেখা যায়। ২০২৩ সালে কিউ-১ ভিসায় চীনগামী বাংলাদেশি নারীর সংখ্যা এক লাফে বেড়ে দাঁড়ায় ১ হাজার ১৬ জনে। ২০২৪ সালে এ সংখ্যা আরও বেড়ে হয় ১ হাজার ৩৭৮। আর ২০২৫ সালে তা ছাড়িয়ে যায় দেড় হাজারের ঘর—চীনে যান ১ হাজার ৭২১ বাংলাদেশি নারী।

অর্থাৎ, মাত্র তিন বছরের ব্যবধানে কিউ-১ ভিসায় চীনে যাওয়া বাংলাদেশি নারীর সংখ্যা ব্যাপকভাবে বেড়েছে।

কিউ-১ ভিসায় চীনে যাওয়া নারীদের সবাই যে পাচারের শিকার হয়েছেন, এমন কোনো তথ্য নেই। তবে ভুয়া বিয়ের মাধ্যমে বাংলাদেশি নারীদের চীনে পাচারের অভিযোগ সামনে আসার পর এই বিপুল সংখ্যক নারী চীনযাত্রা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

বিশেষজ্ঞদের উদ্বেগের জায়গা মূলত এখানেই—বিয়ের উদ্দেশ্যে বিদেশে যাওয়া নারীদের কতজন প্রকৃতপক্ষে স্বামীর সঙ্গে স্বাভাবিক জীবনযাপন করছেন, কতজন নির্যাতনের শিকার হয়েছেন এবং কতজন কোনো না কোনো কারণে দেশে ফিরে এসেছেন, তার নির্ভরযোগ্য তথ্য সংরক্ষণ করা হচ্ছে কি না।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, বিদেশি নাগরিকের সঙ্গে বিয়ের ক্ষেত্রে শুধু কাগজপত্র যাচাই করলেই হবে না; সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির পরিচয়, বৈবাহিক অবস্থা, পেশা, পারিবারিক তথ্য এবং বিয়ের প্রকৃত উদ্দেশ্যও যাচাই করা প্রয়োজন।

সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, বিদেশে ভালো জীবন ও সুখের সংসারের স্বপ্ন দেখিয়ে অসহায় নারীদের একটি অংশকে টার্গেট করছে প্রতারক চক্র। সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে পিছিয়ে থাকা পরিবারের নারীরা এ ধরনের প্রলোভনের ক্ষেত্রে তুলনামূলকভাবে বেশি ঝুঁকিতে পড়তে পারেন।

প্রথমে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম কিংবা পরিচিত ব্যক্তির মাধ্যমে সম্পর্ক তৈরি হতে পারে। এরপর বিয়ে এবং বিদেশে নিয়ে যাওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়। পরিবারকে উন্নত জীবনযাপনের আশ্বাস দেওয়া হলেও বিদেশে যাওয়ার পর বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন হতে পারে—এমন অভিযোগও রয়েছে।

তবে কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তি বা সম্প্রদায়ের সব সদস্যকে এ ধরনের কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত করা ঠিক নয়। অভিযোগের ভিত্তিতে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও চক্রের বিরুদ্ধে যথাযথ তদন্তের মাধ্যমে ব্যবস্থা নেওয়াই জরুরি।

কর্মশালায় ইমিগ্রেশনের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. আবু নোমান জানান, অপরাধী চক্র ভিসা পাওয়ার জন্য ভুয়া কাগজপত্র তৈরি করে বিদ্যমান প্রক্রিয়ার অপব্যবহার করছে। এ ধরনের অপরাধ প্রতিরোধে সম্ভাব্য ভুক্তভোগীদের সুরক্ষায় ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষ বিভিন্ন ব্যবস্থা নিয়েছে বলেও জানান তিনি।

এ কারণে বিদেশি নাগরিকের সঙ্গে বিয়ের ক্ষেত্রে কাগজপত্র যাচাইয়ের পাশাপাশি ভিসা আবেদন ও বিদেশযাত্রার পুরো প্রক্রিয়ায় আরও কঠোর নজরদারির প্রয়োজনীয়তা সামনে এসেছে।

বিদেশি নাগরিকদের সঙ্গে বাংলাদেশি নারীদের বিয়ের বিষয়টি আরও কঠোরভাবে যাচাই-বাছাই করতে একটি প্রস্তাবিত ‘স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসিডিউর’ বা এসওপি বর্তমানে আইন মন্ত্রণালয়ের পর্যালোচনায় রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

প্রস্তাবিত প্রক্রিয়ায় বিয়ে নিবন্ধনের পর বিয়ে সনদ প্রথমে নোটারি পাবলিক এবং পরে আইন মন্ত্রণালয় ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে সত্যায়নের কথা বলা হয়েছে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, এই প্রক্রিয়া কার্যকর হলে ভুয়া পরিচয়, জাল কাগজপত্র এবং বিয়ের আড়ালে মানবপাচারের ঝুঁকি শনাক্ত করা তুলনামূলক সহজ হতে পারে।

মাইগ্রেশন প্রোগ্রাম ও ইয়ুথ প্ল্যাটফর্মের সহযোগী পরিচালক শরীফুল হাসান বলেন, বিদেশি নাগরিককে বিয়ে করার আগে তার পরিচয় ও নাগরিকত্বসহ প্রয়োজনীয় তথ্য যাচাই করা জরুরি। একই সঙ্গে বিয়ের পর বিদেশে যাওয়া নারীদের পরিস্থিতি সম্পর্কে রাষ্ট্রীয়ভাবে তথ্য রাখা প্রয়োজন।

তার মতে, কতজন নারী বিদেশে গেছেন, তাদের মধ্যে কতজন নির্যাতনের শিকার হয়েছেন, কতজন দেশে ফিরে এসেছেন এবং কেন ফিরে এসেছেন—এসব তথ্যের একটি কার্যকর ডাটাবেজ থাকা দরকার।

তিনি আরও বলেন, অসহায় ও দরিদ্র নারীদের টার্গেট করে কেউ বিয়ের নামে অন্য কোনো উদ্দেশ্যে বিদেশে নিয়ে যাচ্ছে কি না, সেটিও সরকারের নজরদারির আওতায় আনা প্রয়োজন।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব ড. জিয়াউদ্দিন আহমেদ বলেন, বিয়ের কথা বলে কোনো নারীকে বিদেশে নিয়ে গিয়ে অন্য কোনো কাজে নিয়োজিত করা বা নির্যাতন করা হলে তা আন্তঃদেশীয় সংঘবদ্ধ অপরাধের আওতায় পড়তে পারে।

তিনি জানান, এ ধরনের বিষয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বিভিন্ন কার্যক্রমের মাধ্যমে মানুষকে সতর্ক করছে। চীনা নাগরিকদের সঙ্গে বিয়ে এবং কিউ-১ ভিসায় বাংলাদেশি নারীদের চীনে যাওয়ার বিষয়টিও সংশ্লিষ্ট দূতাবাসকে অবহিত করা হয়েছে বলে তিনি জানান।

মানবপাচার প্রতিরোধে শুধু সন্দেহজনক বিয়ে বন্ধ করা বা কয়েকটি ঘটনায় ব্যবস্থা নেওয়াই যথেষ্ট নয়। বিদেশি নাগরিকের সঙ্গে বিয়ের ক্ষেত্রে একটি স্বচ্ছ ও কার্যকর যাচাইব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন।

একই সঙ্গে বিদেশে যাওয়া নারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দূতাবাস ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মধ্যে সমন্বয় বাড়ানো, অভিযোগ জানানোর সহজ ব্যবস্থা তৈরি এবং দেশে ফিরে আসা নারীদের তথ্য সংরক্ষণ করা জরুরি।

বিশেষ করে দরিদ্র ও প্রান্তিক পরিবারের নারীদের বিদেশে বিয়ে কিংবা অভিবাসনের ক্ষেত্রে ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতন করতে ইউনিয়ন, উপজেলা ও জেলা পর্যায়ে প্রচারণা চালানোর প্রয়োজন রয়েছে।

বিদেশি নাগরিককে বিয়ে করা নিজেই কোনো অপরাধ নয়। তবে বিয়ের সুযোগকে ব্যবহার করে যদি কোনো নারীকে প্রতারণা, পাচার, নির্যাতন বা শোষণের শিকার করা হয়, তাহলে সেটি অত্যন্ত গুরুতর অপরাধ।

তাই বিদেশে বিয়ের প্রস্তাব পাওয়া নারীদের জন্য পরিচয় যাচাই, বিয়ের নিবন্ধন, ভিসা প্রক্রিয়া এবং বিদেশে অবস্থান—প্রতিটি ধাপে নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি। একই সঙ্গে পরিবারকেও আবেগের পাশাপাশি বাস্তব তথ্য যাচাই করতে হবে।

চীনে কিউ-১ ভিসায় বাংলাদেশি নারীদের যাতায়াতের সংখ্যা দ্রুত বেড়ে যাওয়ার প্রেক্ষাপটে এখনই কার্যকর নজরদারি ও তথ্য সংগ্রহ শুরু করা প্রয়োজন। বিয়ের নামে কোনো নারী যেন প্রতারণার শিকার না হন এবং সুখের সংসারের স্বপ্ন যেন মানবপাচারের ফাঁদে পরিণত না হয়—এটাই এখন সংশ্লিষ্টদের সবচেয়ে বড় প্রত্যাশা।


Nagorik Somoy News

সম্পাদক : মাসুদ রানা


© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত, আমাদের প্রকাশিত সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার অপরাধ।
ভুয়া বিয়ের আড়ালে নারী পাচারের অভিযোগ চীনযাত্রার পরিসংখ্যানে উদ্বেগ
0:00 / 0:00
1x