Nagorik Somoy News

চট্টগ্রামে গণপরিবহনে নৈরাজ্য ও চরম ভোগান্তি



চট্টগ্রামে গণপরিবহনে নৈরাজ্য ও চরম ভোগান্তি
ছবি : নাগরিক সময়

* নতুন ভাড়া নৈরাজ্য রেকর্ড!

* সংশ্লিষ্ট প্রশাসন নীরব: অভিযোগ দীর্ঘদিনের

* তদারকি না থাকায় নেই নির্ধারিত ভাড়া কার্যকারিতা। অপশক্তি সিন্ডিকেটের ফাঁদে সাধারণ যাত্রী জিম্মি

* প্রতিবাদ করলেই মান-সম্মানহানি

* বিপদ আশঙ্কা: অসহায় সাধারণ যাত্রী


চট্টগ্রামে দীর্ঘ ৩ মাস ধরে গ্যাসচালিত পরিবহনে যাত্রীদের হয়রানি, ভোগান্তি, অনিয়ম, অসংগতি, নৈরাজ্য ও অরাজকতার অভিযোগের মধ্যে এখন ডিজেলচালিত পরিবহনেও জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার অজুহাতে গণপরিবহনে নতুন ভাড়া নৈরাজ্য রেকর্ড সৃষ্টি হয়েছে। অনিয়মই যেন নিয়মে পরিণত হয়েছে। যাত্রীসেবা, ভোগান্তি, হয়রানি ও অসংগতি চরমে পৌঁছালেও প্রতিকার নেই।

গণপরিবহনের নজরদারি, তদারকি ও নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠান, নীতিনির্ধারক, দায়িত্বশীল কর্মকর্তা, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এবং মাঠপর্যায়ে সক্রিয় প্রশাসনের দায়িত্বশীল ভূমিকা থাকা সত্ত্বেও নিরাপদ ও জনবান্ধব যাত্রীসেবায় ভোগান্তি বাড়ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। বাস্তব প্রেক্ষাপটে দিনে দিনে নিরাপদ নাগরিক অধিকার নিয়ে জনমনে আস্থাহীনতা তৈরি হচ্ছে।

চট্টগ্রামে গ্যাস সংকটের অজুহাতে গ্যাসচালিত গণপরিবহনে অনিয়ম ও ইচ্ছেমতো ভাড়া আদায়ের অভিযোগের রেশ কাটতে না কাটতেই এবার ডিজেলচালিত পরিবহনেও বাড়তি ভাড়া আদায়ের অভিযোগ উঠেছে। প্রতিনিয়ত দরকষাকষি, তর্কাতর্কি ও বাকবিতণ্ডা নিত্যদিনের অভিযোগে পরিণত হয়েছে। জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির ঘোষণা আসার পরপরই সরকারি অনুমোদিত নতুন ভাড়ার তালিকা বা চার্ট প্রদর্শন ছাড়াই যাত্রীদের কাছ থেকে ইচ্ছেমতো অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের অভিযোগ উঠেছে।

আইন, বিধি ও প্রশাসনিক নির্দেশনা উপেক্ষা করে গণপরিবহনের ভাড়া আদায়কারী সিন্ডিকেট চক্র আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখাচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। মালিক-শ্রমিক, চালক এবং বিভিন্ন নামে পরিচালিত পরিবহন সিন্ডিকেটের তৎপরতায় সাধারণ যাত্রীরা ফের জিম্মি হয়ে পড়েছেন। যাত্রীসেবার পরিবর্তে চলছে পকেট কাটার প্রতিযোগিতা। প্রতিবাদ করলে অনেক ক্ষেত্রে দুর্ব্যবহার ও মারমুখী আচরণের অভিযোগও রয়েছে।

ফলে জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে সাধারণ মানুষের যাতায়াত ব্যয় ও ভোগান্তি আরও বেড়েছে। প্রশ্ন উঠেছে—সরকারি ভাড়া নির্ধারণ ও বাস্তবায়ন তদারকির দায়িত্বে থাকা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ যদি কার্যকরভাবে মাঠে না থাকে, তাহলে যাত্রীদের এই নৈরাজ্য থেকে রক্ষা করবে কে?

চট্টগ্রামের গণপরিবহন খাতে ইচ্ছেমতো ভাড়া আদায় বন্ধ, অনুমোদিত ভাড়ার চার্ট বাধ্যতামূলকভাবে প্রদর্শন এবং যাত্রী হয়রানির বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি উঠেছে। কেউ কি জানে, এর সমাধান ও প্রতিকার কোথায়?

উক্ত বিষয়ে সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল নীতিনির্ধারক কর্মকর্তা, কর্তৃপক্ষ ও প্রশাসনকে সকলের সুদৃষ্টি আকর্ষণে লিখিত বার্তায় একাধিকবার অবগত করা হয়েছে। বাস্তবচিত্র ও বিবরণ তুলে ধরে জনভোগান্তি নিরসনে দ্রুত কার্যকরী ব্যবস্থা ও বিশেষ পদক্ষেপ গ্রহণের অনুরোধ জানানো হয়েছে।

টিআই নাজিম উদ্দিনের বক্তব্য:

টিআই নাজিমউদ্দিন বলেন, পরিবহনে অনিয়মের বিরুদ্ধে নিয়মিত মামলা হচ্ছে। নির্ধারিত স্থানের আগেই যাত্রী নামিয়ে দেওয়া এবং যেখানে গাড়ি ঘোরানোর সুযোগ ছিল—এসব বিষয়েও ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। রেলক্রসিং এলাকায় যেসব স্থান দিয়ে গাড়ি ঘোরানো হতো, সেসব জায়গা দড়ি দিয়ে ব্যারিকেড করে দেওয়া হয়েছে।

তিনি বলেন, দায়িত্ব ও কর্মব্যস্ততার কারণে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত সব খবর নিয়মিত দেখার সুযোগ হয় না। তাঁর দায়িত্বশীল এলাকা শেষশাহ থেকে দুই নম্বর গেট ও বেল ক্রসিং পর্যন্ত। ওই এলাকায় গাড়ি ঘোরানোর যেসব স্থান ছিল, সেগুলোও ব্যারিকেড দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছে।

টিআই নাজিমউদ্দিন আরও বলেন, পরিবহন সংক্রান্ত কোনো অনিয়মের সঠিক তথ্য ও অভিযোগ পেলে অভিযান পরিচালনা করা সহজ হয়। কেউ অভিযোগ করলে সঙ্গে সঙ্গে গাড়ি আটকসহ প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। নিয়মিত অভিযান ও তদারকির পাশাপাশি যাত্রীদের কাছ থেকেও তথ্য নেওয়া হচ্ছে এবং অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া মাত্র ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

টিআই কামাল পাশার বক্তব্য:

টিআই কামাল পাশা বলেন, অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের বিষয়টি নিয়ে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) এবং মালিক সমিতির সঙ্গে আলোচনা ও সমন্বয়ের মাধ্যমে কাজ চলছে। গাড়ির মালিক ও চালক সমিতির প্রতিনিধিদের সঙ্গেও নিয়মিত যোগাযোগ করা হচ্ছে।

তিনি বলেন, কোনো যাত্রী অভিযোগ করলে তাৎক্ষণিকভাবে ব্যবস্থা নেওয়া হয়। এটি শুধু একটি এলাকার সমস্যা নয়; পুরো চট্টগ্রাম শহরের গণপরিবহন ব্যবস্থার সঙ্গে সম্পর্কিত একটি বিষয়। যাত্রীরা অভিযোগ না করলে কোথায় কী ধরনের অনিয়ম হচ্ছে, তা শনাক্ত করা কঠিন।

টিআই কামাল পাশা আরও বলেন, বায়েজিদ এলাকায় তাদের কোনো নির্দিষ্ট পরিবহন স্পট নেই। পরিবহন সমিতির প্রতিনিধিদের সঙ্গে নিয়মিত আলোচনা হচ্ছে। দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে এবং প্রতি মাসেই উল্লেখযোগ্যসংখ্যক গাড়ি আটক করা হচ্ছে। এ-সংক্রান্ত বিস্তারিত তথ্য অফিসের নথিতে পাওয়া যাবে। তিনি জানান, কিছু পরিবহনের মালিক সমিতি না থাকায় সংশ্লিষ্ট শ্রমিক বা চালকরাই বিভিন্ন বিষয়ে যোগাযোগ করেন।

বৃহৎ জনস্বার্থে জনভোগান্তি নিরসন, যাত্রীসেবায় নৈরাজ্য, চরম দুর্ভোগ, অনিয়ম ও অসংগতির বিষয়টি দীর্ঘদিন ধরে দায়িত্বশীল ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, সংশ্লিষ্ট দপ্তর, প্রশাসন, কর্তৃপক্ষ ও মাঠপর্যায়ের প্রশাসনকে লিখিত বার্তায় একাধিকবার অবগত করা হয়েছে।

বিআরটিএ নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ফাহমিদা মোস্তফার বক্তব্য:

বিআরটিএর নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট বলেন, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির কারণে নতুন করে ভাড়ার তালিকা নির্ধারণের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে তিনি জেনেছেন। জুন ও জুলাই মাসের তুলনায় আগস্টে মামলা ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।

তিনি বলেন, এর পেছনে প্রধানত দুটি বিষয় সামনে এসেছে—অবৈধ গ্লিপার বাস চলাচল এবং নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে বেশি ভাড়া আদায়ের অভিযোগ। অভিযান পরিচালনার সময় এসব অভিযোগের কিছু ক্ষেত্রে সত্যতাও পাওয়া গেছে এবং আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

বিআরটিএর এই নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আরও বলেন, “এত বড় একটি ব্যবস্থার মধ্যে আমি খুবই ক্ষুদ্র একজন অংশীদার। তবে আমার চেষ্টা অব্যাহত আছে এবং ভবিষ্যতেও তা চলবে, ইনশাআল্লাহ।”

তিনি বলেন, শুধু মোবাইল কোর্ট পরিচালনার মাধ্যমে সমাজে বিদ্যমান এত বড় ধরনের অসংগতি ও অনিয়ম কতটা নির্মূল করা সম্ভব, সে বিষয়টিও ভাবার প্রয়োজন রয়েছে। এজন্য সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সমন্বিত উদ্যোগ এবং দীর্ঘমেয়াদি তদারকি প্রয়োজন।

সরেজমিনে বাস্তবতা : 

সরেজমিনে বাস্তবতায় আরও দেখা যায়, যাত্রী সাধারণ অনেক ক্ষেত্রেই নীরব। প্রশাসনের নাকের ডগায় গ্যাসচালিত গণপরিবহনে বাড়তি ভাড়া আদায়ের অভিযোগ রয়েছে। তেলের দাম বাড়ার পর ডিজেলচালিত পরিবহনেও নতুন আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। বাড়তি ভাড়ার ইস্যুতে সাধারণ মানুষের পকেটে চাপ বাড়ছে। ডাবল ভাড়া, নানা অনিয়ম ও অসংগতিতে চরম ভোগান্তিতে পড়ছেন সাধারণ মেহনতি শ্রমিক ও নিরীহ যাত্রীরা।

নামে-বেনামে পরিবহন সমিতি ও সংগঠনের নাম ভাঙিয়ে পরিবহন চালক ও শ্রমিকদের অসৎ সিন্ডিকেটের পরিকল্পিত ও কৌশলী তৎপরতায় সাধারণ জনগণ জিম্মি হয়ে পড়ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

এ যেন নৈরাজ্য, অরাজকতা ও মগের মুল্লুক। সাধারণ জনগণের পকেট খালি হচ্ছে। বিশেষ মুহূর্তে সকালে, দুপুরে ও অফিস শেষে ফেরার পথে যাত্রীদের চাপ, ভিড় ও জটলা বাড়লেই অনিয়মের দৌরাত্ম্য বেড়ে যায় বলে অভিযোগ রয়েছে। যাত্রীদের ভিড় দেখলেই বাড়ে অনিয়ম ও অসংগতির দৌরাত্ম্য। যা দীর্ঘদিনের যাত্রীদের গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

তথ্য অনুসন্ধানে দেখা যায়, নৈরাজ্য ও অরাজকতার অভিযোগ দীর্ঘদিনের। গণপরিবহনে যাত্রীসেবা, নিরাপত্তা ও নির্ধারিত ভাড়া—কোনো ক্ষেত্রেই সাধারণ মানুষ কাঙ্ক্ষিত সেবা পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ রয়েছে। প্রতিবাদ করলেই বিপদের আশঙ্কা ও মান-সম্মানহানির ভয়ে অনেকে অভিযোগ বা আপত্তি জানাতে রাজি হন না। ফলে তীব্র ক্ষোভ ও ভোগান্তি সত্ত্বেও অনেক যাত্রী নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করছেন।

সরেজমিন অনুসন্ধানে জানা যায়, ভুক্তভোগী সাধারণ যাত্রীরা অভিযোগের বিষয়ে নির্ধারিত তথ্য, নাম-ঠিকানা কিংবা ঘটনার প্রমাণ দিতে গেলে অনেক সময় নানা ধরনের আপত্তি ও হয়রানির আশঙ্কার কথা জানান। তাদের ভাষ্য, গণপরিবহনে যাত্রী হয়রানি বা অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের বাস্তব চিত্র প্রমাণের জন্য ছবি বা ভিডিও ধারণের চেষ্টা করলেও পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। অভিযোগ রয়েছে, এসব ঘটনার ছবি বা ভিডিও ধারণকে কেন্দ্র করে পরিবহন সংশ্লিষ্ট একটি অংশের মধ্যে উত্তেজনা সৃষ্টি করে বিষয়টি ভিন্ন খাতে নেওয়ার চেষ্টা করা হয়।

নগরীতে গ্যাসচালিত গণপরিবহনে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় ও যাত্রী হয়রানির চিত্র সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, গণমাধ্যম, ইলেকট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়ায় প্রকাশিত হয়েছে। বাড়তি ভাড়া ও অনিয়মের ঘটনায় ভুক্তভোগী জনসাধারণের মধ্যে ব্যাপক সমালোচনা দেখা গেছে। এতে নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষ ও সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের প্রতি আস্থাহীনতা তৈরি হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, কোনো ঘটনার বাস্তব চিত্র প্রকাশ্যে এলে সেটিকে কেন্দ্র করে অপ্রাসঙ্গিক ইস্যু তৈরি, দলবদ্ধভাবে চাপ সৃষ্টি কিংবা বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ার নানা কৌশল নেওয়া হয়। ফলে সাধারণ যাত্রীরা নিজেদের নিরাপত্তা ও সম্মানের কথা বিবেচনা করে অনেক ক্ষেত্রেই ছবি-ভিডিও ধারণ বা প্রকাশ্যে অভিযোগ করা থেকে বিরত থাকেন। এর প্রত্যক্ষদর্শী ও ভুক্তভোগী হিসেবে থেকে যান সাধারণ যাত্রীরাই।

নগরীতে গ্যাসচালিত গণপরিবহনে চালক ও চালকের সহকারীদের (হেলপার) স্বেচ্ছাচারিতা, অতিরিক্ত ভাড়া আদায় এবং যাত্রী হয়রানি এখন চরম আকার ধারণ করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে এ পরিস্থিতি চলে এলেও দৃশ্যমান পরিবর্তন না হয়ে সাধারণ যাত্রীদের ভোগান্তি ও দুর্ভোগ দিন দিন আরও প্রকট হচ্ছে। সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগের চিত্র দেখা যায় স্বল্প দূরত্বের রুটগুলোতে।

নগরীর অক্সিজেন থেকে ২ নম্বর গেট এবং মাঝপথে শেখশাহ থেকে ২ নম্বর গেট—এ ধরনের স্বল্প দূরত্বের যাত্রায় নির্ধারিত ভাড়ার তুলনায় বেশি টাকা নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। সরকার নির্ধারিত ভাড়ার ক্ষেত্রে যেখানে ৮ টাকা নেওয়ার কথা বলে ভুক্তভোগীরা দাবি করছেন, সেখানে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করা হচ্ছে।

প্রতিবাদ করলেই মান-সম্মানহানি বিপদ আশঙ্কা:

ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে বেশি টাকা ও ডাবল ভাড়া আদায় করা হচ্ছে। যাত্রীদের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণ ও অপমানজনক মন্তব্যের অভিযোগও রয়েছে। সাধারণ মানুষ নিরুপায় ও অসহায়। প্রশাসনের নীরবতার কারণে কেউ প্রতিবাদ বা আপত্তি জানাতে ভয় পান। তবে এ নিয়ে তীব্র ক্ষোভ, আক্ষেপ ও অভিযোগ পুঞ্জীভূত হচ্ছে জনমনে।

সাধারণ মানুষ নিয়ম জানার জন্য তথ্য-প্রমাণ ও ভিডিও ধারণ করলে প্রতিবাদ করলেই হেনস্তার শিকার হওয়ার অভিযোগ রয়েছে। উল্টো ভিডিও ধারণের বিষয়টি নিয়ে আপত্তিকর মন্তব্য ও নানা কথাবার্তার মাধ্যমে ভুক্তভোগী যাত্রীদের মোবাইলে ভিডিও ধারণ করে সামাজিকভাবে হেয় করার চেষ্টা করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। স্বল্প দূরত্বের রুটেও অতিরিক্ত ভাড়া—যেমন: অক্সিজেন-২ নম্বর গেট, শেখশাহ-২ নম্বর গেট—আদায়ের অভিযোগ রয়েছে। পরিবহন সমিতির নামে অসৎ সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্যের অভিযোগও রয়েছে।

 যাত্রীদের নিরাপত্তা ও সম্মান নিশ্চিত করতে প্রশাসনের নজরদারির দাবি:

একজন যাত্রী গণপরিবহনে উঠলে তার কাছ থেকে শুধু ভাড়া নেওয়াই নয়, নিরাপদ ও সম্মানজনক সেবা দেওয়াও দায়িত্বের অংশ। নির্ধারিত ভাড়া পরিশোধের পরও যদি কোনো যাত্রীকে অপমান, হয়রানি কিংবা অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়, তাহলে সেটি কেবল ব্যক্তিগত ভোগান্তি নয়; এটি নগর গণপরিবহন ব্যবস্থাপনার একটি বড় প্রশ্ন।

 প্রশাসনের হস্তক্ষেপ ও কঠোর ব্যবস্থা জরুরি: 

গণপরিবহন কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর ব্যক্তিগত নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্র নয়; এটি নগরবাসীর গুরুত্বপূর্ণ নাগরিক সেবা। তাই অতিরিক্ত ভাড়া আদায়, যাত্রী হয়রানি, দুর্ব্যবহার কিংবা প্রতিবাদকারীদের ভয়ভীতি দেখানোর অভিযোগ সত্য প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।

 শক্তপোক্ত ও জোরালো ভূমিকা চায় নগরবাসী:

চট্টগ্রামের মতো গুরুত্বপূর্ণ মহানগরে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক মানুষ গণপরিবহনের ওপর নির্ভরশীল। তাই গণপরিবহনে শৃঙ্খলা, নির্ধারিত ভাড়া ও যাত্রীসেবা নিশ্চিত করা কোনোভাবেই উপেক্ষা করার বিষয় হতে পারে না। গণপরিবহনের লাগামহীন নৈরাজ্য, অরাজকতা ও যাত্রী হয়রানির প্রতিকারে শক্তপোক্ত ও জোরালো ভূমিকা পালন করা জরুরি।

অনতিবিলম্বে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে এসব রুট পরিদর্শন করে অভিযোগগুলো যাচাই এবং আইন লঙ্ঘনের প্রমাণ পাওয়া গে

লে সংশ্লিষ্টদের আইনানুগ ব্যবস্থা ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনা হোক।



আপনার মতামত লিখুন

Nagorik Somoy News

শনিবার, ০৩ অক্টোবর ২০২৬


চট্টগ্রামে গণপরিবহনে নৈরাজ্য ও চরম ভোগান্তি

প্রকাশের তারিখ : ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬

featured Image

* নতুন ভাড়া নৈরাজ্য রেকর্ড!

* সংশ্লিষ্ট প্রশাসন নীরব: অভিযোগ দীর্ঘদিনের

* তদারকি না থাকায় নেই নির্ধারিত ভাড়া কার্যকারিতা। অপশক্তি সিন্ডিকেটের ফাঁদে সাধারণ যাত্রী জিম্মি

* প্রতিবাদ করলেই মান-সম্মানহানি

* বিপদ আশঙ্কা: অসহায় সাধারণ যাত্রী


চট্টগ্রামে দীর্ঘ ৩ মাস ধরে গ্যাসচালিত পরিবহনে যাত্রীদের হয়রানি, ভোগান্তি, অনিয়ম, অসংগতি, নৈরাজ্য ও অরাজকতার অভিযোগের মধ্যে এখন ডিজেলচালিত পরিবহনেও জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার অজুহাতে গণপরিবহনে নতুন ভাড়া নৈরাজ্য রেকর্ড সৃষ্টি হয়েছে। অনিয়মই যেন নিয়মে পরিণত হয়েছে। যাত্রীসেবা, ভোগান্তি, হয়রানি ও অসংগতি চরমে পৌঁছালেও প্রতিকার নেই।

গণপরিবহনের নজরদারি, তদারকি ও নিয়ন্ত্রণকারী প্রতিষ্ঠান, নীতিনির্ধারক, দায়িত্বশীল কর্মকর্তা, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এবং মাঠপর্যায়ে সক্রিয় প্রশাসনের দায়িত্বশীল ভূমিকা থাকা সত্ত্বেও নিরাপদ ও জনবান্ধব যাত্রীসেবায় ভোগান্তি বাড়ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। বাস্তব প্রেক্ষাপটে দিনে দিনে নিরাপদ নাগরিক অধিকার নিয়ে জনমনে আস্থাহীনতা তৈরি হচ্ছে।

চট্টগ্রামে গ্যাস সংকটের অজুহাতে গ্যাসচালিত গণপরিবহনে অনিয়ম ও ইচ্ছেমতো ভাড়া আদায়ের অভিযোগের রেশ কাটতে না কাটতেই এবার ডিজেলচালিত পরিবহনেও বাড়তি ভাড়া আদায়ের অভিযোগ উঠেছে। প্রতিনিয়ত দরকষাকষি, তর্কাতর্কি ও বাকবিতণ্ডা নিত্যদিনের অভিযোগে পরিণত হয়েছে। জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির ঘোষণা আসার পরপরই সরকারি অনুমোদিত নতুন ভাড়ার তালিকা বা চার্ট প্রদর্শন ছাড়াই যাত্রীদের কাছ থেকে ইচ্ছেমতো অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের অভিযোগ উঠেছে।

আইন, বিধি ও প্রশাসনিক নির্দেশনা উপেক্ষা করে গণপরিবহনের ভাড়া আদায়কারী সিন্ডিকেট চক্র আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখাচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। মালিক-শ্রমিক, চালক এবং বিভিন্ন নামে পরিচালিত পরিবহন সিন্ডিকেটের তৎপরতায় সাধারণ যাত্রীরা ফের জিম্মি হয়ে পড়েছেন। যাত্রীসেবার পরিবর্তে চলছে পকেট কাটার প্রতিযোগিতা। প্রতিবাদ করলে অনেক ক্ষেত্রে দুর্ব্যবহার ও মারমুখী আচরণের অভিযোগও রয়েছে।

ফলে জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে সাধারণ মানুষের যাতায়াত ব্যয় ও ভোগান্তি আরও বেড়েছে। প্রশ্ন উঠেছে—সরকারি ভাড়া নির্ধারণ ও বাস্তবায়ন তদারকির দায়িত্বে থাকা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ যদি কার্যকরভাবে মাঠে না থাকে, তাহলে যাত্রীদের এই নৈরাজ্য থেকে রক্ষা করবে কে?

চট্টগ্রামের গণপরিবহন খাতে ইচ্ছেমতো ভাড়া আদায় বন্ধ, অনুমোদিত ভাড়ার চার্ট বাধ্যতামূলকভাবে প্রদর্শন এবং যাত্রী হয়রানির বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি উঠেছে। কেউ কি জানে, এর সমাধান ও প্রতিকার কোথায়?

উক্ত বিষয়ে সংশ্লিষ্ট দায়িত্বশীল নীতিনির্ধারক কর্মকর্তা, কর্তৃপক্ষ ও প্রশাসনকে সকলের সুদৃষ্টি আকর্ষণে লিখিত বার্তায় একাধিকবার অবগত করা হয়েছে। বাস্তবচিত্র ও বিবরণ তুলে ধরে জনভোগান্তি নিরসনে দ্রুত কার্যকরী ব্যবস্থা ও বিশেষ পদক্ষেপ গ্রহণের অনুরোধ জানানো হয়েছে।

টিআই নাজিম উদ্দিনের বক্তব্য:

টিআই নাজিমউদ্দিন বলেন, পরিবহনে অনিয়মের বিরুদ্ধে নিয়মিত মামলা হচ্ছে। নির্ধারিত স্থানের আগেই যাত্রী নামিয়ে দেওয়া এবং যেখানে গাড়ি ঘোরানোর সুযোগ ছিল—এসব বিষয়েও ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। রেলক্রসিং এলাকায় যেসব স্থান দিয়ে গাড়ি ঘোরানো হতো, সেসব জায়গা দড়ি দিয়ে ব্যারিকেড করে দেওয়া হয়েছে।

তিনি বলেন, দায়িত্ব ও কর্মব্যস্ততার কারণে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত সব খবর নিয়মিত দেখার সুযোগ হয় না। তাঁর দায়িত্বশীল এলাকা শেষশাহ থেকে দুই নম্বর গেট ও বেল ক্রসিং পর্যন্ত। ওই এলাকায় গাড়ি ঘোরানোর যেসব স্থান ছিল, সেগুলোও ব্যারিকেড দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছে।

টিআই নাজিমউদ্দিন আরও বলেন, পরিবহন সংক্রান্ত কোনো অনিয়মের সঠিক তথ্য ও অভিযোগ পেলে অভিযান পরিচালনা করা সহজ হয়। কেউ অভিযোগ করলে সঙ্গে সঙ্গে গাড়ি আটকসহ প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। নিয়মিত অভিযান ও তদারকির পাশাপাশি যাত্রীদের কাছ থেকেও তথ্য নেওয়া হচ্ছে এবং অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া মাত্র ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

টিআই কামাল পাশার বক্তব্য:

টিআই কামাল পাশা বলেন, অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের বিষয়টি নিয়ে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) এবং মালিক সমিতির সঙ্গে আলোচনা ও সমন্বয়ের মাধ্যমে কাজ চলছে। গাড়ির মালিক ও চালক সমিতির প্রতিনিধিদের সঙ্গেও নিয়মিত যোগাযোগ করা হচ্ছে।

তিনি বলেন, কোনো যাত্রী অভিযোগ করলে তাৎক্ষণিকভাবে ব্যবস্থা নেওয়া হয়। এটি শুধু একটি এলাকার সমস্যা নয়; পুরো চট্টগ্রাম শহরের গণপরিবহন ব্যবস্থার সঙ্গে সম্পর্কিত একটি বিষয়। যাত্রীরা অভিযোগ না করলে কোথায় কী ধরনের অনিয়ম হচ্ছে, তা শনাক্ত করা কঠিন।

টিআই কামাল পাশা আরও বলেন, বায়েজিদ এলাকায় তাদের কোনো নির্দিষ্ট পরিবহন স্পট নেই। পরিবহন সমিতির প্রতিনিধিদের সঙ্গে নিয়মিত আলোচনা হচ্ছে। দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে এবং প্রতি মাসেই উল্লেখযোগ্যসংখ্যক গাড়ি আটক করা হচ্ছে। এ-সংক্রান্ত বিস্তারিত তথ্য অফিসের নথিতে পাওয়া যাবে। তিনি জানান, কিছু পরিবহনের মালিক সমিতি না থাকায় সংশ্লিষ্ট শ্রমিক বা চালকরাই বিভিন্ন বিষয়ে যোগাযোগ করেন।

বৃহৎ জনস্বার্থে জনভোগান্তি নিরসন, যাত্রীসেবায় নৈরাজ্য, চরম দুর্ভোগ, অনিয়ম ও অসংগতির বিষয়টি দীর্ঘদিন ধরে দায়িত্বশীল ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, সংশ্লিষ্ট দপ্তর, প্রশাসন, কর্তৃপক্ষ ও মাঠপর্যায়ের প্রশাসনকে লিখিত বার্তায় একাধিকবার অবগত করা হয়েছে।

বিআরটিএ নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ফাহমিদা মোস্তফার বক্তব্য:

বিআরটিএর নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট বলেন, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির কারণে নতুন করে ভাড়ার তালিকা নির্ধারণের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে তিনি জেনেছেন। জুন ও জুলাই মাসের তুলনায় আগস্টে মামলা ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।

তিনি বলেন, এর পেছনে প্রধানত দুটি বিষয় সামনে এসেছে—অবৈধ গ্লিপার বাস চলাচল এবং নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে বেশি ভাড়া আদায়ের অভিযোগ। অভিযান পরিচালনার সময় এসব অভিযোগের কিছু ক্ষেত্রে সত্যতাও পাওয়া গেছে এবং আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

বিআরটিএর এই নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আরও বলেন, “এত বড় একটি ব্যবস্থার মধ্যে আমি খুবই ক্ষুদ্র একজন অংশীদার। তবে আমার চেষ্টা অব্যাহত আছে এবং ভবিষ্যতেও তা চলবে, ইনশাআল্লাহ।”

তিনি বলেন, শুধু মোবাইল কোর্ট পরিচালনার মাধ্যমে সমাজে বিদ্যমান এত বড় ধরনের অসংগতি ও অনিয়ম কতটা নির্মূল করা সম্ভব, সে বিষয়টিও ভাবার প্রয়োজন রয়েছে। এজন্য সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের সমন্বিত উদ্যোগ এবং দীর্ঘমেয়াদি তদারকি প্রয়োজন।

সরেজমিনে বাস্তবতা : 

সরেজমিনে বাস্তবতায় আরও দেখা যায়, যাত্রী সাধারণ অনেক ক্ষেত্রেই নীরব। প্রশাসনের নাকের ডগায় গ্যাসচালিত গণপরিবহনে বাড়তি ভাড়া আদায়ের অভিযোগ রয়েছে। তেলের দাম বাড়ার পর ডিজেলচালিত পরিবহনেও নতুন আতঙ্ক তৈরি হয়েছে। বাড়তি ভাড়ার ইস্যুতে সাধারণ মানুষের পকেটে চাপ বাড়ছে। ডাবল ভাড়া, নানা অনিয়ম ও অসংগতিতে চরম ভোগান্তিতে পড়ছেন সাধারণ মেহনতি শ্রমিক ও নিরীহ যাত্রীরা।

নামে-বেনামে পরিবহন সমিতি ও সংগঠনের নাম ভাঙিয়ে পরিবহন চালক ও শ্রমিকদের অসৎ সিন্ডিকেটের পরিকল্পিত ও কৌশলী তৎপরতায় সাধারণ জনগণ জিম্মি হয়ে পড়ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

এ যেন নৈরাজ্য, অরাজকতা ও মগের মুল্লুক। সাধারণ জনগণের পকেট খালি হচ্ছে। বিশেষ মুহূর্তে সকালে, দুপুরে ও অফিস শেষে ফেরার পথে যাত্রীদের চাপ, ভিড় ও জটলা বাড়লেই অনিয়মের দৌরাত্ম্য বেড়ে যায় বলে অভিযোগ রয়েছে। যাত্রীদের ভিড় দেখলেই বাড়ে অনিয়ম ও অসংগতির দৌরাত্ম্য। যা দীর্ঘদিনের যাত্রীদের গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

তথ্য অনুসন্ধানে দেখা যায়, নৈরাজ্য ও অরাজকতার অভিযোগ দীর্ঘদিনের। গণপরিবহনে যাত্রীসেবা, নিরাপত্তা ও নির্ধারিত ভাড়া—কোনো ক্ষেত্রেই সাধারণ মানুষ কাঙ্ক্ষিত সেবা পাচ্ছেন না বলে অভিযোগ রয়েছে। প্রতিবাদ করলেই বিপদের আশঙ্কা ও মান-সম্মানহানির ভয়ে অনেকে অভিযোগ বা আপত্তি জানাতে রাজি হন না। ফলে তীব্র ক্ষোভ ও ভোগান্তি সত্ত্বেও অনেক যাত্রী নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করছেন।

সরেজমিন অনুসন্ধানে জানা যায়, ভুক্তভোগী সাধারণ যাত্রীরা অভিযোগের বিষয়ে নির্ধারিত তথ্য, নাম-ঠিকানা কিংবা ঘটনার প্রমাণ দিতে গেলে অনেক সময় নানা ধরনের আপত্তি ও হয়রানির আশঙ্কার কথা জানান। তাদের ভাষ্য, গণপরিবহনে যাত্রী হয়রানি বা অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের বাস্তব চিত্র প্রমাণের জন্য ছবি বা ভিডিও ধারণের চেষ্টা করলেও পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। অভিযোগ রয়েছে, এসব ঘটনার ছবি বা ভিডিও ধারণকে কেন্দ্র করে পরিবহন সংশ্লিষ্ট একটি অংশের মধ্যে উত্তেজনা সৃষ্টি করে বিষয়টি ভিন্ন খাতে নেওয়ার চেষ্টা করা হয়।

নগরীতে গ্যাসচালিত গণপরিবহনে অতিরিক্ত ভাড়া আদায় ও যাত্রী হয়রানির চিত্র সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, গণমাধ্যম, ইলেকট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়ায় প্রকাশিত হয়েছে। বাড়তি ভাড়া ও অনিয়মের ঘটনায় ভুক্তভোগী জনসাধারণের মধ্যে ব্যাপক সমালোচনা দেখা গেছে। এতে নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষ ও সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের প্রতি আস্থাহীনতা তৈরি হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, কোনো ঘটনার বাস্তব চিত্র প্রকাশ্যে এলে সেটিকে কেন্দ্র করে অপ্রাসঙ্গিক ইস্যু তৈরি, দলবদ্ধভাবে চাপ সৃষ্টি কিংবা বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ার নানা কৌশল নেওয়া হয়। ফলে সাধারণ যাত্রীরা নিজেদের নিরাপত্তা ও সম্মানের কথা বিবেচনা করে অনেক ক্ষেত্রেই ছবি-ভিডিও ধারণ বা প্রকাশ্যে অভিযোগ করা থেকে বিরত থাকেন। এর প্রত্যক্ষদর্শী ও ভুক্তভোগী হিসেবে থেকে যান সাধারণ যাত্রীরাই।

নগরীতে গ্যাসচালিত গণপরিবহনে চালক ও চালকের সহকারীদের (হেলপার) স্বেচ্ছাচারিতা, অতিরিক্ত ভাড়া আদায় এবং যাত্রী হয়রানি এখন চরম আকার ধারণ করেছে বলে অভিযোগ রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে এ পরিস্থিতি চলে এলেও দৃশ্যমান পরিবর্তন না হয়ে সাধারণ যাত্রীদের ভোগান্তি ও দুর্ভোগ দিন দিন আরও প্রকট হচ্ছে। সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগের চিত্র দেখা যায় স্বল্প দূরত্বের রুটগুলোতে।

নগরীর অক্সিজেন থেকে ২ নম্বর গেট এবং মাঝপথে শেখশাহ থেকে ২ নম্বর গেট—এ ধরনের স্বল্প দূরত্বের যাত্রায় নির্ধারিত ভাড়ার তুলনায় বেশি টাকা নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। সরকার নির্ধারিত ভাড়ার ক্ষেত্রে যেখানে ৮ টাকা নেওয়ার কথা বলে ভুক্তভোগীরা দাবি করছেন, সেখানে অতিরিক্ত অর্থ আদায় করা হচ্ছে।

প্রতিবাদ করলেই মান-সম্মানহানি বিপদ আশঙ্কা:

ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, নির্ধারিত ভাড়ার চেয়ে বেশি টাকা ও ডাবল ভাড়া আদায় করা হচ্ছে। যাত্রীদের সঙ্গে অসৌজন্যমূলক আচরণ ও অপমানজনক মন্তব্যের অভিযোগও রয়েছে। সাধারণ মানুষ নিরুপায় ও অসহায়। প্রশাসনের নীরবতার কারণে কেউ প্রতিবাদ বা আপত্তি জানাতে ভয় পান। তবে এ নিয়ে তীব্র ক্ষোভ, আক্ষেপ ও অভিযোগ পুঞ্জীভূত হচ্ছে জনমনে।

সাধারণ মানুষ নিয়ম জানার জন্য তথ্য-প্রমাণ ও ভিডিও ধারণ করলে প্রতিবাদ করলেই হেনস্তার শিকার হওয়ার অভিযোগ রয়েছে। উল্টো ভিডিও ধারণের বিষয়টি নিয়ে আপত্তিকর মন্তব্য ও নানা কথাবার্তার মাধ্যমে ভুক্তভোগী যাত্রীদের মোবাইলে ভিডিও ধারণ করে সামাজিকভাবে হেয় করার চেষ্টা করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। স্বল্প দূরত্বের রুটেও অতিরিক্ত ভাড়া—যেমন: অক্সিজেন-২ নম্বর গেট, শেখশাহ-২ নম্বর গেট—আদায়ের অভিযোগ রয়েছে। পরিবহন সমিতির নামে অসৎ সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্যের অভিযোগও রয়েছে।

 যাত্রীদের নিরাপত্তা ও সম্মান নিশ্চিত করতে প্রশাসনের নজরদারির দাবি:

একজন যাত্রী গণপরিবহনে উঠলে তার কাছ থেকে শুধু ভাড়া নেওয়াই নয়, নিরাপদ ও সম্মানজনক সেবা দেওয়াও দায়িত্বের অংশ। নির্ধারিত ভাড়া পরিশোধের পরও যদি কোনো যাত্রীকে অপমান, হয়রানি কিংবা অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়, তাহলে সেটি কেবল ব্যক্তিগত ভোগান্তি নয়; এটি নগর গণপরিবহন ব্যবস্থাপনার একটি বড় প্রশ্ন।

 প্রশাসনের হস্তক্ষেপ ও কঠোর ব্যবস্থা জরুরি: 

গণপরিবহন কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর ব্যক্তিগত নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্র নয়; এটি নগরবাসীর গুরুত্বপূর্ণ নাগরিক সেবা। তাই অতিরিক্ত ভাড়া আদায়, যাত্রী হয়রানি, দুর্ব্যবহার কিংবা প্রতিবাদকারীদের ভয়ভীতি দেখানোর অভিযোগ সত্য প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।

 শক্তপোক্ত ও জোরালো ভূমিকা চায় নগরবাসী:

চট্টগ্রামের মতো গুরুত্বপূর্ণ মহানগরে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক মানুষ গণপরিবহনের ওপর নির্ভরশীল। তাই গণপরিবহনে শৃঙ্খলা, নির্ধারিত ভাড়া ও যাত্রীসেবা নিশ্চিত করা কোনোভাবেই উপেক্ষা করার বিষয় হতে পারে না। গণপরিবহনের লাগামহীন নৈরাজ্য, অরাজকতা ও যাত্রী হয়রানির প্রতিকারে শক্তপোক্ত ও জোরালো ভূমিকা পালন করা জরুরি।

অনতিবিলম্বে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে এসব রুট পরিদর্শন করে অভিযোগগুলো যাচাই এবং আইন লঙ্ঘনের প্রমাণ পাওয়া গে

লে সংশ্লিষ্টদের আইনানুগ ব্যবস্থা ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনা হোক।




Nagorik Somoy News

সম্পাদক : মাসুদ রানা


© সর্বস্বত্ব স্বত্বাধিকার সংরক্ষিত, আমাদের প্রকাশিত সংবাদ, কলাম, তথ্য, ছবি, পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার অপরাধ।
চট্টগ্রামে গণপরিবহনে নৈরাজ্য ও চরম ভোগান্তি
0:00 / 0:00
1x