পঞ্চগড়ের দেবীগঞ্জ উপজেলার সুন্দরদীঘি শিবেরহাট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষাবর্ষ শুরুর প্রায় আট মাস পেরিয়ে গেলেও পঞ্চম শ্রেণির ২৪ হিন্দু শিক্ষার্থীর হাতে পৌঁছেনি হিন্দুধর্ম শিক্ষা বই। অথচ উপজেলা শিক্ষা অফিসের তথ্য বলছে, বিদ্যালয়গুলোর চাহিদা অনুযায়ী বই সরবরাহ করা হয়েছে। ফলে প্রশ্ন উঠেছে—চাহিদা অনুযায়ী বই সরবরাহ হয়ে থাকলে এই ২৪ শিক্ষার্থী বই পেল না কেন?
মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর) দুপুরে বিদ্যালয়ে সরেজমিনে গিয়ে পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে বই না পাওয়ার বিষয়টি জানা যায়। বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণিতে হিন্দু শিক্ষার্থী রয়েছে ৩১ জন। তাদের মধ্যে ২৪ জনই এখনো হিন্দুধর্ম শিক্ষা বই পায়নি বলে শিক্ষার্থীরা জানায়।
বই না পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করে শিক্ষার্থী বিউটি রানী, নন্দিতা শর্মা, প্রণব রায়, অনুপ দায়, সত্যজিৎ রায়সহ কয়েকজন। দীর্ঘদিন বই না থাকায় অনেকেই সহপাঠীর বই নিয়ে পড়াশোনা করছে। আবার কেউ কেউ বইয়ের প্রয়োজনীয় অংশ ফটোকপি করে বিষয়টি পড়ছে বলে জানা গেছে।
শিক্ষার্থীদের অভিভাবকদের অভিযোগ, শিক্ষাবর্ষের শুরুতেই বই পাওয়ার কথা থাকলেও আট মাসেও তাদের সন্তানদের হাতে বই পৌঁছেনি। এরই মধ্যে আগস্টে দ্বিতীয় সাময়িক পরীক্ষাও শেষ হয়েছে। ফলে নিয়মিত পাঠদান ও পরীক্ষার প্রস্তুতিতে শিক্ষার্থীদের ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে।
চাহিদা ১ হাজার ২৮২, সরবরাহও ১ হাজার ২৮২
প্রাথমিক শিক্ষা দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি শিক্ষাবর্ষে দেবীগঞ্জ উপজেলার সরকারি প্রাথমিক ও কিন্ডারগার্টেন বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণিতে হিন্দু শিক্ষার্থীর সংখ্যা ১ হাজার ২৮২ জন। তাদের জন্য হিন্দুধর্ম শিক্ষা বইয়ের চাহিদাও ছিল ১ হাজার ২৮২টি। শিক্ষা অফিসের দাবি, সমসংখ্যক বই সরবরাহ করা হয়েছে।
কিন্তু সুন্দরদীঘি শিবেরহাট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এসে দেখা যাচ্ছে ভিন্ন চিত্র। সেখানে ৩১ জন হিন্দু শিক্ষার্থীর মধ্যে ২৪ জনই বই ছাড়াই পড়াশোনা করছে। এতে বই সরবরাহের পর তা বিদ্যালয়ে কীভাবে বিতরণ করা হয়েছে, কিংবা চাহিদার সঙ্গে প্রকৃত শিক্ষার্থী সংখ্যার কোনো অসঙ্গতি ছিল কি না—তা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শিরিনা আক্তার বলেন, এ বছর পঞ্চম শ্রেণির হিন্দু ধর্মাবলম্বী শিক্ষার্থীদের জন্য চাহিদা অনুযায়ী বই পাওয়া যায়নি। যে কয়েকটি বই পাওয়া গেছে, সেগুলো দিয়ে শিক্ষার্থীদের গ্রুপ করে পড়ানো হচ্ছে। বই না পাওয়ার বিষয়টি দায়িত্বপ্রাপ্ত উপজেলা সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তাকে জানানো হয়েছিল। তবে এখন বই পাওয়ার সম্ভাবনা নেই বলে তাকে জানানো হয়েছে।
ফুলবাড়ি ক্লাস্টারের দায়িত্বে থাকা সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তা সোহেল শাহজাদা বলেন, গত মাসে বিদ্যালয় পরিদর্শনে গেলে তাকে বই না পাওয়ার বিষয়টি জানানো হয়। তবে প্রধান শিক্ষক নিজে বিষয়টি জানাননি; একজন সহকারী শিক্ষক বিষয়টি জানিয়েছিলেন। এর আগে বই না পাওয়ার বিষয়ে তাকে কেউ অবহিত করেননি বলেও জানান তিনি।
বিদ্যালয়ের চাহিদা অনুযায়ী বই সরবরাহ করা হয়েছিল কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, বই ডিসেম্বর মাসেই দেওয়া হয়েছে। বিষয়টি নিশ্চিত হতে রেজিস্টার খাতা দেখতে হবে। বিদ্যালয় যে চাহিদা দিয়েছিল, সে অনুযায়ী বই দেওয়া হয়েছে। সম্ভবত পরে অতিরিক্ত শিক্ষার্থী ভর্তি হওয়ায় বইয়ের ঘাটতি তৈরি হয়ে থাকতে পারে।
অন্যদিকে দেবীগঞ্জ উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আজমল হোসেন বলেন, বই বিতরণের দায়িত্ব সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তাদের। ওই বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা বই পায়নি—এমন বিষয় তাকে আগে কেউ জানায়নি।
বিষয়টি জানার পর দেবীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ইন্দ্রজীৎ সাহা বলেন, কেন এখনো শিক্ষার্থীরা বই পায়নি, তা খোঁজ নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
এদিকে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের প্রশ্ন, যদি বিদ্যালয়ের চাহিদা অনুযায়ী বই সরবরাহ করা হয়ে থাকে, তাহলে ৩১ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে ২৪ জন কেন আট মাস ধরে বইবিহীন? বইগুলো বিদ্যালয়ে পৌঁছেছিল কি না, পৌঁছে থাকলে বিতরণে কোথাও ঘাটতি হয়েছে কি না—এসব বিষয় এখন স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন।
শিক্ষাবর্ষের বড় একটি সময় পেরিয়ে যাওয়ার পরও এতগুলো শিক্ষার্থী নির্দিষ্ট পাঠ্যবই না পাওয়ায় বিষয়টি শুধু বই সংকটের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে জড়িত রয়েছে পাঠদানের স্বাভাবিক পরিবেশ ও শিক্ষার্থীদের সমান সুযোগ নিশ্চিত করার প্রশ্নও। প্রশাসনের তদন্তে প্রকৃত কারণ বেরিয়ে আসবে এবং দ্রুত বই পাওয়ার ব্যবস্থা হবে—এমনটাই প্রত্যাশা শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের।

শনিবার, ০৩ অক্টোবর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬
পঞ্চগড়ের দেবীগঞ্জ উপজেলার সুন্দরদীঘি শিবেরহাট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষাবর্ষ শুরুর প্রায় আট মাস পেরিয়ে গেলেও পঞ্চম শ্রেণির ২৪ হিন্দু শিক্ষার্থীর হাতে পৌঁছেনি হিন্দুধর্ম শিক্ষা বই। অথচ উপজেলা শিক্ষা অফিসের তথ্য বলছে, বিদ্যালয়গুলোর চাহিদা অনুযায়ী বই সরবরাহ করা হয়েছে। ফলে প্রশ্ন উঠেছে—চাহিদা অনুযায়ী বই সরবরাহ হয়ে থাকলে এই ২৪ শিক্ষার্থী বই পেল না কেন?
মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর) দুপুরে বিদ্যালয়ে সরেজমিনে গিয়ে পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে বই না পাওয়ার বিষয়টি জানা যায়। বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণিতে হিন্দু শিক্ষার্থী রয়েছে ৩১ জন। তাদের মধ্যে ২৪ জনই এখনো হিন্দুধর্ম শিক্ষা বই পায়নি বলে শিক্ষার্থীরা জানায়।
বই না পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করে শিক্ষার্থী বিউটি রানী, নন্দিতা শর্মা, প্রণব রায়, অনুপ দায়, সত্যজিৎ রায়সহ কয়েকজন। দীর্ঘদিন বই না থাকায় অনেকেই সহপাঠীর বই নিয়ে পড়াশোনা করছে। আবার কেউ কেউ বইয়ের প্রয়োজনীয় অংশ ফটোকপি করে বিষয়টি পড়ছে বলে জানা গেছে।
শিক্ষার্থীদের অভিভাবকদের অভিযোগ, শিক্ষাবর্ষের শুরুতেই বই পাওয়ার কথা থাকলেও আট মাসেও তাদের সন্তানদের হাতে বই পৌঁছেনি। এরই মধ্যে আগস্টে দ্বিতীয় সাময়িক পরীক্ষাও শেষ হয়েছে। ফলে নিয়মিত পাঠদান ও পরীক্ষার প্রস্তুতিতে শিক্ষার্থীদের ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে।
চাহিদা ১ হাজার ২৮২, সরবরাহও ১ হাজার ২৮২
প্রাথমিক শিক্ষা দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি শিক্ষাবর্ষে দেবীগঞ্জ উপজেলার সরকারি প্রাথমিক ও কিন্ডারগার্টেন বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণিতে হিন্দু শিক্ষার্থীর সংখ্যা ১ হাজার ২৮২ জন। তাদের জন্য হিন্দুধর্ম শিক্ষা বইয়ের চাহিদাও ছিল ১ হাজার ২৮২টি। শিক্ষা অফিসের দাবি, সমসংখ্যক বই সরবরাহ করা হয়েছে।
কিন্তু সুন্দরদীঘি শিবেরহাট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এসে দেখা যাচ্ছে ভিন্ন চিত্র। সেখানে ৩১ জন হিন্দু শিক্ষার্থীর মধ্যে ২৪ জনই বই ছাড়াই পড়াশোনা করছে। এতে বই সরবরাহের পর তা বিদ্যালয়ে কীভাবে বিতরণ করা হয়েছে, কিংবা চাহিদার সঙ্গে প্রকৃত শিক্ষার্থী সংখ্যার কোনো অসঙ্গতি ছিল কি না—তা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শিরিনা আক্তার বলেন, এ বছর পঞ্চম শ্রেণির হিন্দু ধর্মাবলম্বী শিক্ষার্থীদের জন্য চাহিদা অনুযায়ী বই পাওয়া যায়নি। যে কয়েকটি বই পাওয়া গেছে, সেগুলো দিয়ে শিক্ষার্থীদের গ্রুপ করে পড়ানো হচ্ছে। বই না পাওয়ার বিষয়টি দায়িত্বপ্রাপ্ত উপজেলা সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তাকে জানানো হয়েছিল। তবে এখন বই পাওয়ার সম্ভাবনা নেই বলে তাকে জানানো হয়েছে।
ফুলবাড়ি ক্লাস্টারের দায়িত্বে থাকা সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তা সোহেল শাহজাদা বলেন, গত মাসে বিদ্যালয় পরিদর্শনে গেলে তাকে বই না পাওয়ার বিষয়টি জানানো হয়। তবে প্রধান শিক্ষক নিজে বিষয়টি জানাননি; একজন সহকারী শিক্ষক বিষয়টি জানিয়েছিলেন। এর আগে বই না পাওয়ার বিষয়ে তাকে কেউ অবহিত করেননি বলেও জানান তিনি।
বিদ্যালয়ের চাহিদা অনুযায়ী বই সরবরাহ করা হয়েছিল কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, বই ডিসেম্বর মাসেই দেওয়া হয়েছে। বিষয়টি নিশ্চিত হতে রেজিস্টার খাতা দেখতে হবে। বিদ্যালয় যে চাহিদা দিয়েছিল, সে অনুযায়ী বই দেওয়া হয়েছে। সম্ভবত পরে অতিরিক্ত শিক্ষার্থী ভর্তি হওয়ায় বইয়ের ঘাটতি তৈরি হয়ে থাকতে পারে।
অন্যদিকে দেবীগঞ্জ উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আজমল হোসেন বলেন, বই বিতরণের দায়িত্ব সহকারী শিক্ষা কর্মকর্তাদের। ওই বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা বই পায়নি—এমন বিষয় তাকে আগে কেউ জানায়নি।
বিষয়টি জানার পর দেবীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ইন্দ্রজীৎ সাহা বলেন, কেন এখনো শিক্ষার্থীরা বই পায়নি, তা খোঁজ নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
এদিকে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের প্রশ্ন, যদি বিদ্যালয়ের চাহিদা অনুযায়ী বই সরবরাহ করা হয়ে থাকে, তাহলে ৩১ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে ২৪ জন কেন আট মাস ধরে বইবিহীন? বইগুলো বিদ্যালয়ে পৌঁছেছিল কি না, পৌঁছে থাকলে বিতরণে কোথাও ঘাটতি হয়েছে কি না—এসব বিষয় এখন স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন।
শিক্ষাবর্ষের বড় একটি সময় পেরিয়ে যাওয়ার পরও এতগুলো শিক্ষার্থী নির্দিষ্ট পাঠ্যবই না পাওয়ায় বিষয়টি শুধু বই সংকটের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে জড়িত রয়েছে পাঠদানের স্বাভাবিক পরিবেশ ও শিক্ষার্থীদের সমান সুযোগ নিশ্চিত করার প্রশ্নও। প্রশাসনের তদন্তে প্রকৃত কারণ বেরিয়ে আসবে এবং দ্রুত বই পাওয়ার ব্যবস্থা হবে—এমনটাই প্রত্যাশা শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের।

সম্পাদক : মাসুদ রানা
আপনার মতামত লিখুন