চার কক্ষবিশিষ্ট পাকা বাড়ি, তিন বিঘা ফসলি জমি এবং চলাচলের জন্য নিজস্ব মোটরসাইকেল। সব মিলিয়ে সচ্ছল পরিবারের চিত্র। অথচ সরকারি নথিতে এমন পরিবারকেই ‘অসহায় ও দরিদ্র’ হিসেবে তালিকাভুক্ত করে দেওয়া হচ্ছে ভিজিএফের চাল। অন্যদিকে প্রকৃত দিনমজুর, ভূমিহীন ও অসহায় মানুষ সরকারি সহায়তা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
উপজেলার বালুভরা ইউনিয়ন পরিষদে (ইউপি) দুস্থদের জন্য বরাদ্দ ভিজিএফের চাল বিতরণে এমন অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেছে।
উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন অফিস সূত্রে জানা গেছে, দুই ঈদ উপলক্ষে বালুভরা ইউনিয়নের ১ হাজার ৬৮৭ জন চরম দরিদ্র ও ভূমিহীন পরিবারের জন্য ১০ কেজি করে চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়। তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রকৃত দরিদ্রদের বাদ দিয়ে সচ্ছল ও রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বালুভরা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আল এমরান হোসেন উপজেলা বিএনপির সহসভাপতি হওয়ায় রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে নিয়মনীতি উপেক্ষা করে ভিজিএফের তালিকা তৈরি করা হয়েছে। তবে এ অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্যও নেওয়া হয়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের চাঁদপুর গ্রামের লুৎফর রহমান পেশায় রাজমিস্ত্রি এবং স্থানীয় শ্রমিক দলের নেতা। তাঁর রয়েছে প্রায় তিন বিঘা জমি, পাকা বাড়ি ও নিজস্ব মোটরসাইকেল। এরপরও তাঁর স্ত্রী মালা বেগম ভিজিএফের চাল পাচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
বিষয়টি স্বীকার করে মালা বেগম বলেন, ‘গত দুই ঈদে ভোটার আইডি কার্ড দেখিয়ে চাল পেয়েছি। তবে তালিকায় নাম কীভাবে এসেছে, তা আমার স্বামী ভালো বলতে পারবেন।’
একই ওয়ার্ডের দোনইল গ্রামের বাসিন্দা ফেরদৌস আলীর নামও রয়েছে দরিদ্রদের তালিকায়। স্থানীয়দের ভাষ্য, তিনি একসময় প্রবাসে ছিলেন। বর্তমানে ঢাকায় নিরাপত্তাপ্রহরীর চাকরি করেন। তাঁর গ্রামে প্রায় চার বিঘা জমি ও একটি আধাপাকা বাড়ি রয়েছে বলেও স্থানীয়রা দাবি করেন।
এ ছাড়া ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ডের বারাতৈল, ৪ নম্বর ওয়ার্ডের মির্জাপুর এবং ৭ নম্বর ওয়ার্ডের পশ্চিম বালুভরা গ্রামেও সচ্ছল ব্যক্তিদের নাম ভিজিএফের তালিকায় থাকার অভিযোগ পাওয়া গেছে।
স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুল লতিফ ও মামুন অভিযোগ করে বলেন, ‘প্রভাবশালীদের সঙ্গে সখ্য থাকলেই সরকারি সহায়তার কার্ড পাওয়া যায়। অথচ আমরা যারা দিন আনি দিন খাই, তাদের কপালে কিছুই জোটে না।’
এ বিষয়ে ৬ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য ইদ্রিস আলী চেয়ারম্যানের ওপর দায় চাপিয়ে বলেন, ‘আমি ৫০টি কার্ড পেয়েছিলাম। সেগুলো প্রকৃত দরিদ্রদের মধ্যে বিতরণ করেছি। তবে লুৎফর রহমানের পরিবার সরকারি দল করার সুবাদে কার্ড পেয়েছে।’
তবে ভিজিএফের তালিকায় সচ্ছল পরিবারের নাম থাকার অভিযোগ অস্বীকার না করে ভিন্ন ব্যাখ্যা দিয়েছেন বালুভরা ইউপি চেয়ারম্যান আল এমরান হোসেন। তিনি ভিজিএফের চালকে ‘ঈদ উপহার’ হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, ‘আমরা ঈদ বোনাস হিসেবে সবাইকে চাল দিয়ে থাকি। এখানে ৪০ শতাংশ দলীয় এবং বাকি কার্ড চেয়ারম্যান-মেম্বারদের মধ্যে ভাগ করা হয়। ঈদ বোনাস হিসেবে কিছু সচ্ছল পরিবারের নাম থাকতেই পারে, যা অস্বীকার করার উপায় নেই।’
এ বিষয়ে বদলগাছী উপজেলা ভারপ্রাপ্ত প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) মো. মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘ভিজিএফের চাল বিতরণে কোনো অনিয়ম ও স্বজনপ্রীতি হয়ে থাকলে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
স্থানীয়দের দাবি, ভিজিএফের তালিকা পুনরায় যাচাই-বাছাই করে প্রকৃত দরিদ্র, ভূমিহীন ও দিনমজুরদের অন্তর্ভুক্ত করা হোক। একই সঙ্গে সরকারি সহায়তার তালিকা প্রণয়ন ও চাল বিতরণে কোনো ধরনের অনিয়ম হয়ে থাকলে তা তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।

শনিবার, ০৩ অক্টোবর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬
চার কক্ষবিশিষ্ট পাকা বাড়ি, তিন বিঘা ফসলি জমি এবং চলাচলের জন্য নিজস্ব মোটরসাইকেল। সব মিলিয়ে সচ্ছল পরিবারের চিত্র। অথচ সরকারি নথিতে এমন পরিবারকেই ‘অসহায় ও দরিদ্র’ হিসেবে তালিকাভুক্ত করে দেওয়া হচ্ছে ভিজিএফের চাল। অন্যদিকে প্রকৃত দিনমজুর, ভূমিহীন ও অসহায় মানুষ সরকারি সহায়তা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
উপজেলার বালুভরা ইউনিয়ন পরিষদে (ইউপি) দুস্থদের জন্য বরাদ্দ ভিজিএফের চাল বিতরণে এমন অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেছে।
উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন অফিস সূত্রে জানা গেছে, দুই ঈদ উপলক্ষে বালুভরা ইউনিয়নের ১ হাজার ৬৮৭ জন চরম দরিদ্র ও ভূমিহীন পরিবারের জন্য ১০ কেজি করে চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়। তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রকৃত দরিদ্রদের বাদ দিয়ে সচ্ছল ও রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ব্যক্তিদের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বালুভরা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আল এমরান হোসেন উপজেলা বিএনপির সহসভাপতি হওয়ায় রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে নিয়মনীতি উপেক্ষা করে ভিজিএফের তালিকা তৈরি করা হয়েছে। তবে এ অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্যও নেওয়া হয়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ইউনিয়নের ৬ নম্বর ওয়ার্ডের চাঁদপুর গ্রামের লুৎফর রহমান পেশায় রাজমিস্ত্রি এবং স্থানীয় শ্রমিক দলের নেতা। তাঁর রয়েছে প্রায় তিন বিঘা জমি, পাকা বাড়ি ও নিজস্ব মোটরসাইকেল। এরপরও তাঁর স্ত্রী মালা বেগম ভিজিএফের চাল পাচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
বিষয়টি স্বীকার করে মালা বেগম বলেন, ‘গত দুই ঈদে ভোটার আইডি কার্ড দেখিয়ে চাল পেয়েছি। তবে তালিকায় নাম কীভাবে এসেছে, তা আমার স্বামী ভালো বলতে পারবেন।’
একই ওয়ার্ডের দোনইল গ্রামের বাসিন্দা ফেরদৌস আলীর নামও রয়েছে দরিদ্রদের তালিকায়। স্থানীয়দের ভাষ্য, তিনি একসময় প্রবাসে ছিলেন। বর্তমানে ঢাকায় নিরাপত্তাপ্রহরীর চাকরি করেন। তাঁর গ্রামে প্রায় চার বিঘা জমি ও একটি আধাপাকা বাড়ি রয়েছে বলেও স্থানীয়রা দাবি করেন।
এ ছাড়া ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ডের বারাতৈল, ৪ নম্বর ওয়ার্ডের মির্জাপুর এবং ৭ নম্বর ওয়ার্ডের পশ্চিম বালুভরা গ্রামেও সচ্ছল ব্যক্তিদের নাম ভিজিএফের তালিকায় থাকার অভিযোগ পাওয়া গেছে।
স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুল লতিফ ও মামুন অভিযোগ করে বলেন, ‘প্রভাবশালীদের সঙ্গে সখ্য থাকলেই সরকারি সহায়তার কার্ড পাওয়া যায়। অথচ আমরা যারা দিন আনি দিন খাই, তাদের কপালে কিছুই জোটে না।’
এ বিষয়ে ৬ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য ইদ্রিস আলী চেয়ারম্যানের ওপর দায় চাপিয়ে বলেন, ‘আমি ৫০টি কার্ড পেয়েছিলাম। সেগুলো প্রকৃত দরিদ্রদের মধ্যে বিতরণ করেছি। তবে লুৎফর রহমানের পরিবার সরকারি দল করার সুবাদে কার্ড পেয়েছে।’
তবে ভিজিএফের তালিকায় সচ্ছল পরিবারের নাম থাকার অভিযোগ অস্বীকার না করে ভিন্ন ব্যাখ্যা দিয়েছেন বালুভরা ইউপি চেয়ারম্যান আল এমরান হোসেন। তিনি ভিজিএফের চালকে ‘ঈদ উপহার’ হিসেবে উল্লেখ করে বলেন, ‘আমরা ঈদ বোনাস হিসেবে সবাইকে চাল দিয়ে থাকি। এখানে ৪০ শতাংশ দলীয় এবং বাকি কার্ড চেয়ারম্যান-মেম্বারদের মধ্যে ভাগ করা হয়। ঈদ বোনাস হিসেবে কিছু সচ্ছল পরিবারের নাম থাকতেই পারে, যা অস্বীকার করার উপায় নেই।’
এ বিষয়ে বদলগাছী উপজেলা ভারপ্রাপ্ত প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (পিআইও) মো. মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘ভিজিএফের চাল বিতরণে কোনো অনিয়ম ও স্বজনপ্রীতি হয়ে থাকলে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
স্থানীয়দের দাবি, ভিজিএফের তালিকা পুনরায় যাচাই-বাছাই করে প্রকৃত দরিদ্র, ভূমিহীন ও দিনমজুরদের অন্তর্ভুক্ত করা হোক। একই সঙ্গে সরকারি সহায়তার তালিকা প্রণয়ন ও চাল বিতরণে কোনো ধরনের অনিয়ম হয়ে থাকলে তা তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।

সম্পাদক : মাসুদ রানা
আপনার মতামত লিখুন