নওগাঁ জেলার পত্নীতলা থানা বাংলাদেশের প্রাচীনতম থানাগুলোর মধ্যে অন্যতম। ব্রিটিশ ভারতে আধুনিক পুলিশিং ব্যবস্থার যাত্রার শুরুর দিকেই প্রতিষ্ঠিত হয় ঐতিহ্যবাহী এই থানা। দীর্ঘ সময় ধরে প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা ও জননিরাপত্তায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে পত্নীতলা থানা।
পত্নীতলা থানা পরিদর্শন করে থানার ইতিহাস, ঐতিহ্য, ভৌগোলিক গুরুত্ব, জনসংখ্যা এবং বর্তমান আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে বিশ্লেষণ করেছেন নওগাঁর পুলিশ সুপার মোহাম্মদ তারিকুল ইসলাম।
পুলিশ সুপার জানান, ভারতবর্ষে ব্রিটিশ শাসনের শুরুর দিকে আধুনিক পুলিশ প্রশাসন প্রতিষ্ঠার অংশ হিসেবে ১৭৯২ সালের ৭ নভেম্বর বেঙ্গল প্রেসিডেন্সি সরকারের অধীনে থানা বা পুলিশি প্রশাসনিক ইউনিট প্রতিষ্ঠার কার্যক্রম শুরু হয়। ওই সময় জেলা ম্যাজিস্ট্রেটদের নিজ নিজ এলাকাকে পুলিশি এখতিয়ারভুক্ত থানায় বিভক্ত করার নির্দেশ দেওয়া হয়। সময়ের পরিক্রমায় এসব থানা গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক ইউনিটে পরিণত হয়।
প্রশাসনিক আধুনিকায়নের ধারাবাহিকতায় ১৮০৭ সালে পত্নীতলা থানা প্রতিষ্ঠিত হয়। তখন এটি অবিভক্ত ভারতের পশ্চিম দিনাজপুর জেলার অন্তর্ভুক্ত ছিল। পরবর্তীতে প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাসের অংশ হিসেবে ১৯১১-১২ সালের দিকে পত্নীতলা থানার উত্তর-পূর্বাঞ্চল নিয়ে ধামইরহাট থানা গঠিত হয়।
১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর র্যাডক্লিফ রোয়েদাদ অনুযায়ী পত্নীতলা থানা বগুড়া জেলার অন্তর্ভুক্ত হয়। পরে ১৯৫০ সালে এটি নওগাঁ মহকুমার অন্তর্ভুক্ত হয়। ১৯৮৩ সালে পুলিশি থানাকে ভিত্তি করে পত্নীতলা উপজেলা গঠিত হয়। আর এই থানাকে কেন্দ্র করেই সময়ের পরিবর্তনে গড়ে ওঠে বর্তমানের নজিপুর শহর।
বর্তমানে পত্নীতলা উপজেলা একটি পৌরসভা ও ১১টি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত। উপজেলার রয়েছে সমৃদ্ধ ইতিহাস, ঐতিহ্য ও প্রত্নসম্পদ।
কৈবর্ত বিদ্রোহের স্মৃতিবাহী দিবর দিঘী
পত্নীতলা থানা এলাকার অন্যতম ঐতিহাসিক নিদর্শন দিবর দিঘী ও দিব্যক জয়স্তম্ভ। কৈবর্ত বিদ্রোহের বিজয়ের স্মৃতিবাহী এই জয়স্তম্ভ আজও ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
একাদশ শতাব্দীতে পাল বংশের শাসনামলে বরেন্দ্র অঞ্চলে সংঘটিত গণঅভ্যুত্থান ইতিহাসে কৈবর্ত বিদ্রোহ নামে পরিচিত। ঐতিহাসিক দিবর দিঘীর মাঝখানে অবস্থিত গ্রানাইট পাথরের দিব্যক জয়স্তম্ভ সেই ঐতিহাসিক বিজয়ের স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে বিবেচিত। ইতিহাসবিদদের মতে, কৈবর্ত বিদ্রোহের নায়ক দিব্যকের অনুসারীরা বিজয়কে স্মরণীয় করে রাখতে বিশাল এই দিঘী খনন ও জয়স্তম্ভ নির্মাণ করেছিলেন।
বৈচিত্র্যময় জনগোষ্ঠীর বসবাস
সর্বশেষ আদমশুমারি অনুযায়ী পত্নীতলা উপজেলার জনসংখ্যা প্রায় পৌনে তিন লাখ। এর প্রায় অর্ধেক নারী। মোট জনসংখ্যার প্রায় ৭৮ দশমিক ৮৪ শতাংশ মুসলিম, ১৭ দশমিক ৮২ শতাংশ হিন্দু, ২ দশমিক ০৯ শতাংশ খ্রিস্টান এবং অবশিষ্ট জনগোষ্ঠী অন্যান্য ধর্মের অনুসারী।
এ উপজেলায় প্রায় ১৭ থেকে ১৮ হাজার ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষ বসবাস করেন। তাঁদের মধ্যে ওরাঁও, সাঁওতাল ও মুন্ডা সম্প্রদায়ের মানুষ উল্লেখযোগ্য।
সীমান্তবর্তী হওয়ায় চোরাচালান বড় চ্যালেঞ্জ
ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে পত্নীতলা থানার রয়েছে বিশেষ গুরুত্ব। উপজেলার উত্তর সীমান্তে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের দক্ষিণ দিনাজপুর জেলা অবস্থিত। পত্নীতলার নিরমইল ও শিহাড়া ইউনিয়ন সরাসরি ভারতীয় সীমান্তের সঙ্গে যুক্ত।
সীমান্তবর্তী হওয়ায় এই থানা এলাকার অপরাধ চিত্রে চোরাচালান একটি উল্লেখযোগ্য বিষয়। এর পাশাপাশি ভূমি সংক্রান্ত বিরোধ, মারামারি, মাদক, চুরি ও ছিনতাইসহ বিভিন্ন অপরাধ মোকাবিলা করতে হয় পুলিশকে।
চোরাচালান ও মাদক প্রতিরোধে সীমান্ত এলাকায় বিজিবি এবং থানা এলাকায় পুলিশ আগের তুলনায় আরও সক্রিয় রয়েছে। সীমান্তবর্তী এলাকায় অপরাধ নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মধ্যে সমন্বয়ও জোরদার করা হয়েছে।
নওগাঁর পুলিশ সুপার মোহাম্মদ তারিকুল ইসলাম বলেন, পত্নীতলা থানার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে জেলা পুলিশ সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছে। চোরাচালান ও মাদক প্রতিরোধের পাশাপাশি ভূমি সংক্রান্ত বিরোধ, মারামারি, চুরি, ছিনতাইসহ অন্যান্য অপরাধ নিয়ন্ত্রণে পুলিশের তৎপরতা আরও জোরদার করা হয়েছে।
তিনি বলেন, “জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা পুলিশের প্রধান দায়িত্ব। পত্নীতলা থানা এলাকার মানুষের জানমালের নিরাপত্তায় নওগাঁ জেলা পুলিশ সর্বদা সতর্ক ও সক্রিয় রয়েছে।”
দীর্ঘ ইতিহাস, সমৃদ্ধ ঐতিহ্য, প্রত্নসম্পদ, বৈচিত্র্যময় জনগোষ্ঠী এবং সীমান্তবর্তী গুরুত্বপূর্ণ ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে পত্নীতলা থানা নওগাঁ জেলার পাশাপাশি দেশের পুলিশ প্রশাসনের ইতিহাসেও একটি গুরুত্বপূর্ণ ও ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিত।

শনিবার, ০৩ অক্টোবর ২০২৬
প্রকাশের তারিখ : ০৭ আগস্ট ২০২৬
নওগাঁ জেলার পত্নীতলা থানা বাংলাদেশের প্রাচীনতম থানাগুলোর মধ্যে অন্যতম। ব্রিটিশ ভারতে আধুনিক পুলিশিং ব্যবস্থার যাত্রার শুরুর দিকেই প্রতিষ্ঠিত হয় ঐতিহ্যবাহী এই থানা। দীর্ঘ সময় ধরে প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষা ও জননিরাপত্তায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে পত্নীতলা থানা।
পত্নীতলা থানা পরিদর্শন করে থানার ইতিহাস, ঐতিহ্য, ভৌগোলিক গুরুত্ব, জনসংখ্যা এবং বর্তমান আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে বিশ্লেষণ করেছেন নওগাঁর পুলিশ সুপার মোহাম্মদ তারিকুল ইসলাম।
পুলিশ সুপার জানান, ভারতবর্ষে ব্রিটিশ শাসনের শুরুর দিকে আধুনিক পুলিশ প্রশাসন প্রতিষ্ঠার অংশ হিসেবে ১৭৯২ সালের ৭ নভেম্বর বেঙ্গল প্রেসিডেন্সি সরকারের অধীনে থানা বা পুলিশি প্রশাসনিক ইউনিট প্রতিষ্ঠার কার্যক্রম শুরু হয়। ওই সময় জেলা ম্যাজিস্ট্রেটদের নিজ নিজ এলাকাকে পুলিশি এখতিয়ারভুক্ত থানায় বিভক্ত করার নির্দেশ দেওয়া হয়। সময়ের পরিক্রমায় এসব থানা গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক ইউনিটে পরিণত হয়।
প্রশাসনিক আধুনিকায়নের ধারাবাহিকতায় ১৮০৭ সালে পত্নীতলা থানা প্রতিষ্ঠিত হয়। তখন এটি অবিভক্ত ভারতের পশ্চিম দিনাজপুর জেলার অন্তর্ভুক্ত ছিল। পরবর্তীতে প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাসের অংশ হিসেবে ১৯১১-১২ সালের দিকে পত্নীতলা থানার উত্তর-পূর্বাঞ্চল নিয়ে ধামইরহাট থানা গঠিত হয়।
১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর র্যাডক্লিফ রোয়েদাদ অনুযায়ী পত্নীতলা থানা বগুড়া জেলার অন্তর্ভুক্ত হয়। পরে ১৯৫০ সালে এটি নওগাঁ মহকুমার অন্তর্ভুক্ত হয়। ১৯৮৩ সালে পুলিশি থানাকে ভিত্তি করে পত্নীতলা উপজেলা গঠিত হয়। আর এই থানাকে কেন্দ্র করেই সময়ের পরিবর্তনে গড়ে ওঠে বর্তমানের নজিপুর শহর।
বর্তমানে পত্নীতলা উপজেলা একটি পৌরসভা ও ১১টি ইউনিয়ন নিয়ে গঠিত। উপজেলার রয়েছে সমৃদ্ধ ইতিহাস, ঐতিহ্য ও প্রত্নসম্পদ।
কৈবর্ত বিদ্রোহের স্মৃতিবাহী দিবর দিঘী
পত্নীতলা থানা এলাকার অন্যতম ঐতিহাসিক নিদর্শন দিবর দিঘী ও দিব্যক জয়স্তম্ভ। কৈবর্ত বিদ্রোহের বিজয়ের স্মৃতিবাহী এই জয়স্তম্ভ আজও ইতিহাসের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
একাদশ শতাব্দীতে পাল বংশের শাসনামলে বরেন্দ্র অঞ্চলে সংঘটিত গণঅভ্যুত্থান ইতিহাসে কৈবর্ত বিদ্রোহ নামে পরিচিত। ঐতিহাসিক দিবর দিঘীর মাঝখানে অবস্থিত গ্রানাইট পাথরের দিব্যক জয়স্তম্ভ সেই ঐতিহাসিক বিজয়ের স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে বিবেচিত। ইতিহাসবিদদের মতে, কৈবর্ত বিদ্রোহের নায়ক দিব্যকের অনুসারীরা বিজয়কে স্মরণীয় করে রাখতে বিশাল এই দিঘী খনন ও জয়স্তম্ভ নির্মাণ করেছিলেন।
বৈচিত্র্যময় জনগোষ্ঠীর বসবাস
সর্বশেষ আদমশুমারি অনুযায়ী পত্নীতলা উপজেলার জনসংখ্যা প্রায় পৌনে তিন লাখ। এর প্রায় অর্ধেক নারী। মোট জনসংখ্যার প্রায় ৭৮ দশমিক ৮৪ শতাংশ মুসলিম, ১৭ দশমিক ৮২ শতাংশ হিন্দু, ২ দশমিক ০৯ শতাংশ খ্রিস্টান এবং অবশিষ্ট জনগোষ্ঠী অন্যান্য ধর্মের অনুসারী।
এ উপজেলায় প্রায় ১৭ থেকে ১৮ হাজার ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষ বসবাস করেন। তাঁদের মধ্যে ওরাঁও, সাঁওতাল ও মুন্ডা সম্প্রদায়ের মানুষ উল্লেখযোগ্য।
সীমান্তবর্তী হওয়ায় চোরাচালান বড় চ্যালেঞ্জ
ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে পত্নীতলা থানার রয়েছে বিশেষ গুরুত্ব। উপজেলার উত্তর সীমান্তে ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের দক্ষিণ দিনাজপুর জেলা অবস্থিত। পত্নীতলার নিরমইল ও শিহাড়া ইউনিয়ন সরাসরি ভারতীয় সীমান্তের সঙ্গে যুক্ত।
সীমান্তবর্তী হওয়ায় এই থানা এলাকার অপরাধ চিত্রে চোরাচালান একটি উল্লেখযোগ্য বিষয়। এর পাশাপাশি ভূমি সংক্রান্ত বিরোধ, মারামারি, মাদক, চুরি ও ছিনতাইসহ বিভিন্ন অপরাধ মোকাবিলা করতে হয় পুলিশকে।
চোরাচালান ও মাদক প্রতিরোধে সীমান্ত এলাকায় বিজিবি এবং থানা এলাকায় পুলিশ আগের তুলনায় আরও সক্রিয় রয়েছে। সীমান্তবর্তী এলাকায় অপরাধ নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর মধ্যে সমন্বয়ও জোরদার করা হয়েছে।
নওগাঁর পুলিশ সুপার মোহাম্মদ তারিকুল ইসলাম বলেন, পত্নীতলা থানার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে জেলা পুলিশ সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছে। চোরাচালান ও মাদক প্রতিরোধের পাশাপাশি ভূমি সংক্রান্ত বিরোধ, মারামারি, চুরি, ছিনতাইসহ অন্যান্য অপরাধ নিয়ন্ত্রণে পুলিশের তৎপরতা আরও জোরদার করা হয়েছে।
তিনি বলেন, “জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা পুলিশের প্রধান দায়িত্ব। পত্নীতলা থানা এলাকার মানুষের জানমালের নিরাপত্তায় নওগাঁ জেলা পুলিশ সর্বদা সতর্ক ও সক্রিয় রয়েছে।”
দীর্ঘ ইতিহাস, সমৃদ্ধ ঐতিহ্য, প্রত্নসম্পদ, বৈচিত্র্যময় জনগোষ্ঠী এবং সীমান্তবর্তী গুরুত্বপূর্ণ ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে পত্নীতলা থানা নওগাঁ জেলার পাশাপাশি দেশের পুলিশ প্রশাসনের ইতিহাসেও একটি গুরুত্বপূর্ণ ও ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিত।

সম্পাদক : মাসুদ রানা
আপনার মতামত লিখুন