উচ্চ মানের ছবি তৈরি হচ্ছে... অপেক্ষা করুন
নাগরিক সময় ডিজিটাল : ||
তৈরি পোশাক খাতে শ্রমিক আন্দোলনে ইন্ধন ও অর্থায়নের অভিযোগ খতিয়ে দেখতে দুই শতাধিক ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাব জব্দ এবং লেনদেনের তথ্য তলবের উদ্যোগ নিয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। এ তালিকায় সাবেক মন্ত্রী, সাবেক সংসদ সদস্য, প্রভাবশালী ব্যবসায়ী এবং তৈরি পোশাকশিল্পের একাধিক উদ্যোক্তার নাম রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন বেক্সিমকো গ্রুপের মালিক সালমান এফ রহমান, সাবেক বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি, সাবেক সংসদ সদস্য ও এনভয় গ্রুপের মালিক আবদুস সালাম মুর্শেদী এবং তৈরি পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সাবেক সভাপতি এস এম মান্নান কচিসহ আরও অনেকে।এনবিআরের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স সেল (সিআইসি) এবং আয়কর গোয়েন্দা ও তদন্ত ইউনিট এ বিষয়ে পদক্ষেপ নিয়েছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাব জব্দের উদ্যোগের পাশাপাশি লেনদেনের বিস্তারিত তথ্য সংগ্রহের জন্যও নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে বলে এনবিআর সূত্রে জানা গেছে। তবে ব্যক্তি পর্যায়ে ব্যাংক হিসাব জব্দের উদ্যোগ থাকলেও ব্যবসায়িক কার্যক্রমের স্বার্থ বিবেচনায় সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের লেনদেনের তথ্য চাওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।এর আগে গত মঙ্গলবার এনবিআরের একটি অনুষ্ঠানে সংস্থাটির চেয়ারম্যান আহসান হাবিব কিছু ব্যক্তি ও পরিবারের ব্যাংক হিসাব জব্দের উদ্যোগের কথা জানান। তিনি বলেন, বিশেষ একটি কারণে সিআইসি ও আয়কর গোয়েন্দা বিভাগ ৩৪ ব্যক্তি ও ৩৪ পরিবারের ব্যাংক হিসাব জব্দের উদ্যোগ নিয়েছে। পরবর্তী সময়ে প্রাথমিক তালিকার বাইরে আরও ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের নাম যুক্ত হওয়ায় সংশ্লিষ্টদের সংখ্যা বেড়ে দুই শতাধিক হয়েছে বলে সূত্রের বরাতে জানা গেছে।এনবিআরের এ উদ্যোগের মূল লক্ষ্য তৈরি পোশাক খাতে চলমান শ্রমিক অসন্তোষের পেছনে অর্থায়ন, ইন্ধন কিংবা অন্য কোনো ধরনের আর্থিক সংশ্লিষ্টতা রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা। তবে তালিকাভুক্ত হওয়া বা ব্যাংক হিসাবসংক্রান্ত অনুসন্ধানের আওতায় আসা মানেই কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান অভিযোগে জড়িত—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই। তদন্তের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট অভিযোগের সত্যতা যাচাই করা প্রয়োজন।তালিকায় সাবেক মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যদের নামএনবিআরের নজরে থাকা ব্যক্তিদের তালিকায় সাবেক সরকারের কয়েকজন মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও সংসদ সদস্যের নাম রয়েছে বলে জানা গেছে। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন সাবেক বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি, সাবেক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম, সাবেক বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ এবং সাবেক স্থানীয় সরকারমন্ত্রী তাজুল ইসলাম।এ ছাড়া তালিকায় রয়েছেন বেক্সিমকো গ্রুপের মালিক ও সাবেক সংসদ সদস্য সালমান এফ রহমান এবং সাবেক সংসদ সদস্য ও এনভয় গ্রুপের মালিক আবদুস সালাম মুর্শেদী। সাবেক সংসদ সদস্য ইলিয়াস উদ্দিন মোল্লাহ এবং শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত সহকারী হিসেবে পরিচিত জাহাঙ্গীর আলমের ব্যাংক হিসাব জব্দের উদ্যোগ নেওয়ার তথ্যও পাওয়া গেছে।রাজনৈতিক ও ব্যবসায়িক অঙ্গনে পরিচিত এসব ব্যক্তির নাম তালিকায় আসায় বিষয়টি নিয়ে আলোচনা তৈরি হয়েছে। তবে তাঁদের প্রত্যেকের বিরুদ্ধে নির্দিষ্ট অভিযোগের ধরন, সংশ্লিষ্ট আর্থিক লেনদেনের প্রকৃতি এবং তদন্তের অগ্রগতি সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য এখনো স্পষ্ট নয়। ফলে অভিযোগের ভিত্তি ও সংশ্লিষ্টতার মাত্রা নির্ধারণে তদন্তের ফলাফল গুরুত্বপূর্ণ হবে।পোশাকশিল্পের প্রভাবশালী উদ্যোক্তারাও নজরদারিতেতৈরি পোশাক খাতের একাধিক পরিচিত ব্যবসায়ী ও শিল্পগোষ্ঠীর সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নামও তালিকায় রয়েছে বলে জানা গেছে। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন ওয়েল গ্রুপের আবদুস সালাম, নিপা গ্রুপের খসরু চৌধুরী, স্ট্যান্ডার্ড গ্রুপের একেএম মোশাররফ হোসেন এবং তুসুকা গ্রুপের ফয়জুর রহমান।এ ছাড়া মণ্ডল গ্রুপের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কয়েকজনের নামও তালিকায় রয়েছে। তৈরি পোশাক প্রস্তুত ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সাবেক সভাপতি এস এম মান্নান কচি এবং তাঁর পরিবারের সদস্যদের নামও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে বলে সূত্র জানিয়েছে।তৈরি পোশাক খাত দেশের রপ্তানি আয়, কর্মসংস্থান এবং শিল্প উৎপাদনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। এ খাতে শ্রমিক অসন্তোষ বা আন্দোলনের পেছনে অর্থায়ন ও সংগঠিত তৎপরতার অভিযোগ উঠলে তার আর্থিক দিক অনুসন্ধান করা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্তের অংশ হতে পারে। তবে কোনো শিল্পগোষ্ঠী বা উদ্যোক্তার নাম তালিকায় থাকার ভিত্তিতে তাঁদের বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত হয়েছে বলে ধরে নেওয়া যাবে না।তালিকায় আরও যাঁদের নাম রয়েছেপ্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ওয়েল গ্রুপের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হিসেবে নাসরিন আক্তার, সৈয়দ নুরুল ইসলাম, সৈয়দ নজরুল ইসলাম, সৈয়দ সহিদুল ইসলাম, সৈয়দ তৌফিকুল ইসলাম, জান্নাতুল ইসলাম, আফরোজা বেগম ও ডা. নাসরিন আফরোজের নাম রয়েছে।তুসুকা গ্রুপের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মধ্যে রয়েছেন ফিরোজ আলম, রেফায়েত উল্লাহ খান, মো. শফিকুল ইসলাম, ইকবাল কবির, আরশাদ জামাল, ইকরামুল হক, মো. আতিকুজ্জামান সাগর ও আতিকুজ্জামান রিপন।এ ছাড়া তালিকায় রয়েছেন আব্দুল আলিম মণ্ডল, মো. জুবায়ের মণ্ডল, তারিন তাসলিমা, সুলতানা খাতুন, মাসুদা খাতুন, হাজী আব্দুল মান্নান মণ্ডল, মোমেনা খাতুন, আব্দুল মমিন মণ্ডল, মাহমুদুল হাসান, জান্নাতুল ফেরদৌস, আসাদুর রহমান শিকদার, গোলাম ফারুক তালুকদার, মোহাম্মদ জাহিদ হোসাইন, সুরভী রহমান, শিরিন ইসলাম, তাসলিমা আক্তার, খন্দকার ফারুক কায়সার ও নাহিদ খন্দকার।তালিকার অন্য নামগুলোর মধ্যে রয়েছেন হাজী আব্দুল মজিদ মণ্ডল, খতিব আব্দুল হাদী, সিভিল ইঞ্জিনিয়ার্সের হোসনে আরা বেগম, ইঞ্জিনিয়ার আতিকুর রহমান, মাহমুদা বেগম, ইঞ্জিনিয়ার মোসারফ হোসেন, তাসমিয়া রহমান, হাসনাত মোশারফ ও ফারিয়া রহমানতবে তালিকায় থাকা সব ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে ব্যাংক হিসাব জব্দের নির্দেশ কার্যকর হয়েছে কি না, নাকি কারও ক্ষেত্রে শুধু লেনদেনের তথ্য চাওয়া হয়েছে—সে বিষয়ে পূর্ণাঙ্গ ও পৃথক তথ্য প্রকাশিত হয়নি। তাই তালিকাভুক্তির ধরন এবং প্রত্যেকের বিরুদ্ধে অনুসন্ধানের সুনির্দিষ্ট কারণ আলাদাভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।পোশাক খাতের অস্থিরতা নিয়ে সরকারের অভিযোগসম্প্রতি সচিবালয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ অভিযোগ করেন, তৈরি পোশাক খাতে চলমান অস্থিরতার পেছনে নিষিদ্ধ রাজনৈতিক সংগঠনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সাবেক মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও সংসদ সদস্যদের ইন্ধন রয়েছে। এ কাজে কিছু শিল্পমালিকও জড়িত বলে সরকারের কাছে তথ্য-প্রমাণ রয়েছে বলেও তিনি দাবি করেন।সরকারের এ বক্তব্যের পর শ্রমিক আন্দোলন ঘিরে সম্ভাব্য অর্থায়ন ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা নিয়ে আলোচনা আরও গুরুত্ব পেয়েছে। এনবিআরের ব্যাংক হিসাবসংক্রান্ত উদ্যোগকে সেই প্রেক্ষাপটে আর্থিক লেনদেন যাচাইয়ের পদক্ষেপ হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর অভিযোগ এবং এনবিআরের তদন্তের মধ্যে সুনির্দিষ্ট যোগসূত্র কী, তা সংশ্লিষ্ট নথি ও কর্তৃপক্ষের বক্তব্যের মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।এনবিআরের সিআইসি ও আয়কর গোয়েন্দা ও তদন্ত ইউনিটের উদ্যোগে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের আর্থিক লেনদেন খতিয়ে দেখা হলে শ্রমিক আন্দোলনে অর্থায়নের অভিযোগের পক্ষে বা বিপক্ষে তথ্য পাওয়া যেতে পারে। একই সঙ্গে কোনো লেনদেনের সঙ্গে শ্রমিক অসন্তোষের সম্পর্ক রয়েছে কি না, তা নির্ধারণেও প্রমাণভিত্তিক অনুসন্ধান গুরুত্বপূর্ণ।অন্যদিকে, ব্যাংক হিসাব জব্দ বা লেনদেনের তথ্য তলবের মতো পদক্ষেপ ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের আর্থিক কার্যক্রমে প্রভাব ফেলতে পারে। তাই এ ধরনের উদ্যোগের ক্ষেত্রে আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ, অভিযোগের সুনির্দিষ্ট ভিত্তি নির্ধারণ এবং সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য গ্রহণ গুরুত্বপূর্ণসব মিলিয়ে, তৈরি পোশাক খাতে শ্রমিক আন্দোলনে ইন্ধন ও অর্থায়নের অভিযোগ ঘিরে এনবিআরের অনুসন্ধান এখন আলোচনার কেন্দ্রে। তবে তালিকায় থাকা ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে অভিযোগের সত্যতা, তাঁদের প্রকৃত সংশ্লিষ্টতা এবং গৃহীত পদক্ষেপের পরিধি নির্ধারিত হবে তদন্তের ফলাফল ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক তথ্যের ভিত্তিতে।