উচ্চ মানের ছবি তৈরি হচ্ছে... অপেক্ষা করুন
নাগরিক সময় ডেস্ক : ||
হিমালয়ের নেপাল-চীন সীমান্তে ভয়াবহ আকস্মিক বন্যা ও পাহাড়ি ধস আবারও চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে—পর্বত অঞ্চলে শুরু হওয়া বড় কোনো দুর্যোগের প্রভাব সীমান্তের মধ্যেই আটকে থাকে না। নদীর প্রবাহ ধরে তা দ্রুত নিচের জনপদে ছড়িয়ে পড়তে পারে। নেপালের সাম্প্রতিক বিপর্যয়ের পর ভারতের নদী অববাহিকা ও হিমালয়সংলগ্ন এলাকাতেও তাই সতর্কতা বাড়ানো হয়েছে।২৬ আগস্ট নেপাল-চীন সীমান্তবর্তী হিমালয় অঞ্চলে ভয়াবহ বন্যা ও ধসের সূত্রপাত হয়। প্রাথমিক অনুসন্ধানে দেখা গেছে, হিমবাহের একটি বড় অংশ ও পাহাড়ের পাথর ধসে নদীতে পড়ে। এতে সাময়িকভাবে নদীর প্রবাহ আটকে গিয়ে পরে প্রবল স্রোতে পানি, কাদা, বরফ ও পাথর নিচের দিকে নেমে আসে। কয়েকটি এলাকায় মাত্র কয়েক মিনিটের মধ্যে নদীর পানি অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যায়।বন্যার স্রোতে বসতবাড়ি, সড়ক, সেতু, বিদ্যুৎ প্রকল্প ও সীমান্ত অবকাঠামোর ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। উদ্ধারকাজও দুর্গম পাহাড়ি ভূপ্রকৃতি, ক্ষতিগ্রস্ত যোগাযোগব্যবস্থা ও নতুন করে বন্যার আশঙ্কার কারণে কঠিন হয়ে পড়েছে। ২৮ আগস্ট পর্যন্ত বিভিন্ন প্রতিবেদনে নেপাল ও তিব্বতে কয়েক শ মানুষের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে এবং বিপুলসংখ্যক মানুষ নিখোঁজ রয়েছেন। উদ্ধার অভিযান অব্যাহত থাকায় হতাহতের সংখ্যা আরও পরিবর্তিত হতে পারে।বিশেষজ্ঞদের প্রাথমিক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ঘটনাটি ছিল একাধিক প্রাকৃতিক প্রক্রিয়ার ধারাবাহিক ফল। হিমালয়ের উচ্চভূমিতে বরফ ও পাথরের বড় অংশ বিচ্ছিন্ন হয়ে নিচে নেমে নদীর ওপর প্রচুর ধ্বংসাবশেষ জমা করে। এতে তৈরি হয় এক ধরনের প্রাকৃতিক বাঁধ। পরে সেই বাধা ভেঙে গেলে বিপুল পানি ও ধ্বংসাবশেষের স্রোত নিম্নাঞ্চলের দিকে ধেয়ে যায়।এ ধরনের ঘটনায় শুধু বৃষ্টিপাতকে দায়ী করা যায় না। হিমবাহের অস্থিতিশীলতা, পাহাড়ের ঢালে বরফ-পাথরের পরিবর্তন এবং নদীর স্বাভাবিক প্রবাহে বাধা—সবকিছু একসঙ্গে বড় বিপর্যয় তৈরি করতে পারে।নেপালের পাহাড়ি নদীগুলোর অনেকগুলোই শেষ পর্যন্ত ভারতের বিস্তীর্ণ সমতল অঞ্চলের নদী ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত। বিশেষ করে ত্রিশূলী নদী পরে নারায়ণী নদীর সঙ্গে যুক্ত হয়ে ভারতের বিহারে গণ্ডক নামে প্রবাহিত হয়। ফলে নেপালের পাহাড়ি এলাকায় বড় ধরনের আকস্মিক বন্যা হলে তার প্রভাব নদীর নিম্ন অববাহিকায় পৌঁছানোর সম্ভাবনা থাকে।সাম্প্রতিক বিপর্যয়ের পর ভারতের বিহার, উত্তর প্রদেশ ও উত্তরাখণ্ডের কিছু এলাকায় নদীর পানি বৃদ্ধি ও বন্যার সম্ভাবনা নিয়ে সতর্কতা নেওয়া হয়েছে। ফলে নেপালের এই দুর্যোগকে শুধু একটি দেশের স্থানীয় বিপর্যয় হিসেবে না দেখে পুরো হিমালয় ও আন্তঃসীমান্ত নদী অববাহিকার ঝুঁকি হিসেবে দেখার প্রয়োজনীয়তা আরও স্পষ্ট হয়েছে।হিমালয় অঞ্চলে তাপমাত্রা বৃদ্ধি ও জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে হিমবাহ এবং বরফনির্ভর জলাধারগুলোর ওপর চাপ বাড়ছে। বিশেষজ্ঞরা দীর্ঘদিন ধরেই সতর্ক করে আসছেন যে উচ্চ হিমালয়ের কিছু হিমবাহ ও হিমবাহ-হ্রদ ভবিষ্যতে আকস্মিক বন্যার ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।বিজ্ঞানীরা বলছেন, এ ধরনের দুর্যোগের ঝুঁকি মূল্যায়নে শুধু আবহাওয়ার পূর্বাভাস যথেষ্ট নয়। হিমবাহের অবস্থান, পাহাড়ের স্থিতিশীলতা, নদীর প্রবাহ এবং সম্ভাব্য হিমবাহ-হ্রদ নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করাও জরুরি। হিমালয়জুড়ে উচ্চঝুঁকির বহু হিমবাহ-হ্রদ রয়েছে বলেও গবেষকরা সতর্ক করেছেন।হিমালয়ের দুর্গম এলাকায় সড়ক, সেতু, বিদ্যুৎকেন্দ্র, পর্যটন অবকাঠামো ও বসতি দ্রুত বাড়ছে। এসব স্থাপনা যদি ঝুঁকিপূর্ণ নদী উপত্যকা বা পাহাড়ের অস্থিতিশীল ঢালে গড়ে ওঠে, তাহলে প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা অনেক বেড়ে যেতে পারে।সাম্প্রতিক বন্যায় সড়ক ও সেতু ধ্বংস হওয়ায় দুর্গত এলাকায় উদ্ধারকর্মীদের পৌঁছাতেও সমস্যা হয়েছে। এতে স্পষ্ট হয়েছে, দুর্যোগ মোকাবিলায় শুধু অবকাঠামো নির্মাণ নয়, কোথায় অবকাঠামো নির্মাণ করা হচ্ছে—সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ।সাম্প্রতিক বন্যার পর ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় একটি নতুন জলাধার বা ব্যারিয়ার লেক তৈরি হওয়ায় উদ্বেগ আরও বেড়েছে। ২৮ আগস্ট ওই জলাধার থেকে পানি উপচে পড়ার খবর পাওয়ার পর কিছু এলাকায় উদ্ধার কার্যক্রম সাময়িকভাবে বাধাগ্রস্ত হয়। নতুন করে পানি নেমে এলে নিচের নদী অববাহিকায় আবারও আকস্মিক বন্যার আশঙ্কা তৈরি হতে পারে বলে সতর্ক করা হয়েছে।বিশেষজ্ঞদের মতে, হিমালয় অঞ্চলের দুর্যোগ মোকাবিলায় একক দেশের উদ্যোগ যথেষ্ট নয়। নেপাল, ভারত, চীনসহ সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর মধ্যে তথ্য বিনিময়, নদীর পানি পর্যবেক্ষণ এবং আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন।উপগ্রহ চিত্র, রিমোট সেন্সিং, ড্রোন ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক বিশ্লেষণ ব্যবহার করে ঝুঁকিপূর্ণ হিমবাহ, হ্রদ ও নদী অববাহিকা পর্যবেক্ষণ করা যেতে পারে। একই সঙ্গে স্থানীয় জনগণকে দ্রুত সতর্ক করার কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি।সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—হিমালয়কে কোনো দেশের রাজনৈতিক সীমানা দিয়ে আলাদা করা যায় না। পাহাড়ের পানি নদী হয়ে সীমান্ত অতিক্রম করে সমতলে নামে। তাই দুর্যোগ ব্যবস্থাপনাতেও রাজনৈতিক সীমারেখার বদলে পুরো নদী অববাহিকা ও পাহাড়ি পরিবেশব্যবস্থাকে বিবেচনায় নেওয়া এখন সময়ের দাবি।নেপালের সাম্প্রতিক বিপর্যয় শুধু একটি ভয়াবহ দুর্যোগের খবর নয়; এটি পুরো হিমালয় অঞ্চল ও দক্ষিণ এশিয়ার জন্য ভবিষ্যৎ দুর্যোগঝুঁকি মোকাবিলায় আরও কার্যকর প্রস্তুতির একটি বড় সতর্কবার্তা।তথ্যসূত্র: Reuters, BBC, The Guardian, AP, Al Jazeera ও Nature